সত্যবতীর বিদায়
শীতের এক সুগভীর কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরবেলায় অত্যন্ত ময়লা কাপড় দিয়ে বাঁধা একটা পুঁটলি হাতে করে এক বৃদ্ধা রাজকুমার রায়ের প্রকাণ্ড ফটকওয়ালা বাড়ির ভিতরের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রথমে ঢুকতে একটু দ্বিধা করেছিল, কারণ এ-বাড়িতে সে এই প্রথম পদার্পণ করছে, কিন্তু মুহূর্ত পরেই সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে এক নিঃসংকোচ কলেজ-বালিকার মতোই চাকর-বাকরের ছুটোছুটি আর কোলাহল-কাতর উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধার চেহারা এমন কদাকার যে হঠাৎ দেখলে ভয় হয়। উঁচু কপাল, তুবড়ানো নাক, মাংসল মুখ অথচ চোখ দুটি অত্যন্ত ছোটো এবং গর্তে বসানো। মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা, বয়স পঞ্চাশের বেশি হলেও গায়ের চামড়া এখনও যথেষ্ট ঢিলে হয়ে আসেনি।
বৃদ্ধা কারুর আশায় এদিক-ওদিক চেয়ে শেষে একটা চাকরকে ডেকে বলল, ‘আচ্ছা, এটা আমাদের রাজুর বাড়ি না?’
‘রাজু! রাজু কে!’ এই বলে চাকরটা আবার নিমেষে কোথায় উধাও হয়ে গেল।
রাজু কে! তবে কি এটা রাজুর বাড়ি নয়? বৃদ্ধা মনে মনে খানিকটা অসহায় বোধ করল। কিন্তু বাইরে সে-ভাব সম্পূর্ণ ঢেকে রেখে আর একজনকে ডেকে বলল, ‘আচ্ছা, এটা আমাদের রাজুর বাড়ি নয়?’
ঝি মতির মা খন খন করে বলল, ‘রাজু-টাজু কেউ এখানে নেই গো।’
কিন্তু এমন সময় ভেতর থেকে মনোরমা বলল, ‘কে রে মতির মা?’ এই বলে আর মতির মা-র উত্তরের অপেক্ষা না করে ধীরে ধীরে ভারী শরীরখানা নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। তার চোখে চশমা, হাতে অনেকগুলি চুড়ি, গায়ে আঁটো-সাঁটো সেমিজ, চওড়া নকশি-পেড়ে শাড়ি। বুড়িকে দেখে মনোরমা আশ্চর্য হল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ সেই বিস্ময়ের ভাব দমন করে ফেলল, বরং চোখের ওপরে ভ্রু কুঁচকে এসেছে।
একগাল হেসে সত্যবতী বলল, ‘বউ কেমন আছ? আচ্ছা, তোমাদের কতকাল দেখিনে, তোমাদের কথা ভেবে-ভেবে হয়রান হয়ে গেলুম, ঈশ্বরকে কত বলি, ঠাকুর, আমার ছেলে, ছেলের বউ, সব থাকতে আমি ষাটের বুড়ি, কেন এত কষ্ট করে মরি? ছেলে তো আমার এমন নয় যে কক্খনো ডাক-খোঁজ করে না। আমার রাজুর মতো ছেলে কারুর হয়? কক্খনো হয় না, এই আমি বলে দিচ্ছি। এই তো সেবার’—এক দুই তিন চার...সত্যবতী হাতের কর গুনে বলল, ‘পাঁচটা টাকার জন্যে দু-অক্ষর লিখে পাঠিয়ে দিলুম, আর অমনি তোমায় কী বলব বউ, আর অমনি যেন হাওয়ার গাড়িতে চড়ে টাকা এসে হাজির!’ বলতে বলতে সত্যবতীর দম বন্ধ হয়ে এল।
ইতিমধ্যেই প্রায় সারা বাড়িতে সাড়া পড়ে গিয়েছে। বাড়ির সমস্ত ছেলেমেয়েরা—মন্টু-ঘেন্টু-জিতু-বেলা-হেলা ইত্যাদি সবাই এসে বুড়িকে ঘিরে দাঁড়াল। সকলের ছোটো জিতু এই কুৎসিত বুড়িকে আর কখনও দেখেনি, সে মনোরমার আঁচল ধরে নাকি সুরে বলল, ‘কে ঠাকুমা?’
সত্যবতী হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আয় ভাই আয়, তোদের নাম কী রে ভাই? আরে আয় না? না এই রাজকন্যার মতো সুন্দরী বউকে দেখে পছন্দ হচ্ছে না?’ সত্যবতী একটু পরিহাস করল। ওদিকে মনোরমার শীতলতাও তার দৃষ্টি এড়ায়নি। সে তাকে খুশি করবার জন্যে বলল, ‘তোমাকে ভারি শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে বউ। কোনো অসুখ করেছে বুঝি?’
মনোরমা সংক্ষেপে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘না, কোনো অসুখ করেনি।
ওপরের পড়ার ঘরে বসে ইন্দু প্রাণপণে কলেজের পড়া মুখস্থ করছিল। নতুন মানুষের সাড়া পেয়ে বারান্দার ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘মা, কে এসেছে?’
মা একবার ওপর দিকে চাইল মাত্র, কিছু বলল না।
সত্যবতী চোখ বড়ো করে বলল, ‘বউ আমি বলে দিচ্ছি, তোমার কোনো অসুখ করেছে, তুমি না বললে আমি শুনব কেন? দাঁড়াও, আমি ওষুধ দিয়ে দেব।’ সত্যবতী বছর দুই আগে নাকি কালী পেয়েছিল, তাঁর আশীর্বাদে একটা মূল্যবান ওষুধও পেয়েছিল, তাই সত্যবতী মনোরমাকে অভয় দিল।
মন্টুরা একেবারে হাঁ করে তার দিকে চেয়ে ছিল, এমন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments