মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো
’৭১-এর এপ্রিলের শেষ দিকে ‘ডাক’-এর উদ্যোগে ঈশ্বরদী মোটর স্ট্যান্ডে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হলো। তখন এ এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আমি সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তবে বৃহৎ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতাদের অহমিকার কারণে মাঝে-মাঝেই আমাদের কর্মীদের সাথে তাদের বাকবিতন্ডা চলছে।
একদিনের ঘটনা বলি। ঈশ্বরদীতে তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। আমাদের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা টেনিং নিতে আগ্রহী দেখে আমি ঈশ্বরদী পে-অফিসের নিরাপত্তা রক্ষীদের সাথে যোগাযোগ করে সাতটি থ্রি-নট থ্রি রাইফেল সংগ্রহ করে দিলাম ওদের। ওদিকে তখন সারা মাড়োয়ারি হাইস্কুলে ছাত্রলীগ কর্মীদেরও টেনিং চলছে। তো এই রাইফেল নিয়েই শুরু হলো ছাত্রলীগ কর্মী নেতাদের সাথে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের রেষারেষি। ছাত্রলীগ মনে করছে, প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলার অধিকার একমাত্র তাদেরই আছে। অন্য কোনো সংগঠন এর মধ্যে নাক গলাক, তা ওদের পছন্দ নয়। ওরা কয়েকদিন হুমকি দিয়ে গেলো এই বলে, রাইফেলগুলো তাদের কাছে জমা দিতে হবে নইলে অসুবিধা আছে। আমাদের ছেলেরা ওদের কথা কানেই তুললো না।
আমার বাসা তখন ঈশ্বরদী স্কুল পাড়ায়। একদিন দুপুরবেলা ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী কালাম ছুটতে ছুটতে এলো আমার বাড়িতে। আমার বড় মেয়ে বিলু চেঁচিয়ে ডাকলো, “খোকা! খোকা বাইরে এসে দেখো কালাম ভাইকে কারা যেনো ধরতে আসছে।” ঘর থেকে বাইরে এসে দেখি কালাম হাঁফাতে হাঁফাতে এসে উঠলো উঠোনে। পেছন পেছন এলো আরও দু'জন ছেলে। হাতে তাদের রাইফেল। আমি ছেলে দুটোকে ডেকে জিগ্যেস করলাম, “ওকে তাড়া করছো কেনো? কি হয়েছে?” ওরা বললো, “ওদের কাছে যে রাইফেলগুলো আছে ওগুলো এখনি দিয়ে দিতে হবে। নইলে খুন করবো ওকে।” বললাম, “রাইফেলগুলো ওদের কাছে থাকলে ক্ষতিটা কোথায়? ওরাওতো যুদ্ধ করবে। দেশ স্বাধীন করার ঠিকেদারিতো তোমরা একা নাও নি? আমরাওতো এদেশের মানুষ। দেশ মুক্ত করার দায়িত্বতো আমাদেরও আছে, নাকি বলো?” ছেলেরা তবুও নাছোড়। বললো, “ওসব বুঝি না। রাইফেলগুলো আমাদের চাই-ই।” বললাম, “রাইফেল তোমাদের দেয়া হবে না। আর জোর করে যদি নিতেই চাও, তবে গোলাগুলি করেই নিতে হবে। যাও, এখন চলে যাও এখান থেকে।” ছেলেগুলো ফুঁসতে ফুঁসতে বিদেয় হলো।
যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে শুধু ঈশ্বরদীতেই নয়, বাংলাদেশের সর্বত্রই এই বিরোধ লেগেছিলো আওয়ামী লীগ কর্মীদের সাথে।
’৭১-এর মার্চের শেষে আওয়ামী লীগের আবদুল আজিজ (মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নকশালদের হাতে নিহত হন), ফকির নুরুল ইসলাম ও মহিউদ্দিন (প্রাক্তন সংসদ সদস্য) প্রমুখের সাথে মিলে পরামর্শ করা হলো, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে যে চোদ্দজন পাকসেনা রয়েছে, তাদের আত্মসমর্পণ করাতে হবে।
এই চোদ্দজন পাকসেনার মধ্যে সাতজনই ছিলেন বাঙালি। তাদের কমান্ডে ছিলেন। একজন বাঙালি ক্যাপ্টেন। নাম সম্ভবত ক্যাপ্টেন আহসান। এই বাঙালি ক্যাপ্টেনের ইচ্ছানুযায়ীই আত্মসমর্পণ করানোর পরিকল্পনা করা হলো। তবে এই আত্মসমর্পণ হতে হবে জেনেভা চুক্তি মোতাবেক। বাঙালি সৈন্যরা যদি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চান, তবে যুদ্ধ করবেন। আর বাকি ছয়জন পাঞ্জাবি সেনাকে হত্যা না করে বন্দি করে রাখা হবে। এর ফলে আমাদের লোকবল ও অস্ত্রবল দুই-ই বাড়বে। পরামর্শ অনুযায়ী ১ এপ্রিল আত্মসমর্পণের দিন ধার্য করা হলো। এর মধ্যে ঈশ্বরদী ও তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক সাড়া জেগেছে, প্রতিরোধ আন্দোলনের।
সেদিনটির কথা আজও মনে আছে। গ্রাম থেকে হাজার হাজার লোক এসেছে। বিমানবন্দরের সেনা শিবিরটি ঘিরে আছে তারা। ক্যাপ্টেন আহসান ও তার তেরোজন সৈন্য একে একে অস্ত্র সমর্পণ করলেন প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে। তাঁদের সবাইকে বন্দী করা হলো। জনতা উল্লাসে ফেটে পড়লো পাকসেনাদের তারা বন্দি করতে পেরেছে বলে। পরবর্তী সময়ে ক্যাপ্টেন আহসান ও তাঁর অধীনস্ত সাতজন বাঙালি সৈন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন। কিন্তু ছয়জন পাঞ্জাবি সৈন্যকে কিছুতেই রক্ষা করা গেলো না। আমাদের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments