প্রান্ত থেকে যিনি কেন্দ্র কাঁপিয়েছেন

শিক্ষক, অধ্যাপক, পণ্ডিত, গণসংস্কৃতির পুরোধা, দার্শনিক, চিন্তাবিদ, জ্ঞানতাপস, বুদ্ধিজীবী, সাম্যবাদী, প্রাবন্ধিক—কত পরিচয়েই না অভিষিক্ত ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের মতই তিনি নিছক জীবিত নয়, বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। যদিও শেষ জীবনের কয়েক বছর বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধি তাঁর চিন্তা-তৎপরতাকে সীমিত করে ফেলেছিল। কিন্তু যতদিন সক্ষম ছিলেন—ততদিন প্রান্ত থেকে কেন্দ্রকে কাঁপিয়েছেন নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার কর্মযজ্ঞে। আর এই লক্ষ্যে স্থিতধী থেকে তিনি অভিযান চালিয়েছেন স্থানিক থেকে বৈশ্বিক জ্ঞান-ভাণ্ডারে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছিলেন—মানব জাতির এ যাবৎকালের লব্ধ জ্ঞান-ভাণ্ডারের সার অংশকে। মননশীলতায় তিনি ছিলেন বিচিত্রগামী। মার্কস থেকে মাইজভান্ডারী, লালন থেকে লেনিন, বিবেকানন্দ থেকে আল্লামা ইকবাল, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন থেকে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ—সর্বত্রই ছিল তাঁর আগ্রহী বিচরণ। লুকাচ, গ্রামসী, স্ট্যালিন, মাও সে তুঙ—সবার কাছ থেকে গ্রহণ করতে তাঁর বাধেনি। মার্কস এবং বুদ্ধ—একই সঙ্গে উভয়েরই শিষ্য হতে তাঁর সমস্যা হয়নি।

এ অঞ্চলের লোকায়ত বস্তুবাদী দর্শনের ঐতিহ্য অনুসন্ধানে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। সমাজতন্ত্রকে শুধু ইউরোপীয় উৎস থেকে গ্রহণ করেননি বরং বাঙালীর সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য থেকেও তিনি প্রাণরস সংগ্রহ করেছেন। বাংলার নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থেকেও তিনি তারই সাধক হয়েছিলেন। এ অঞ্চলের মুসলিম সমাজের অগ্রসর ও প্রগতিশীল চিন্তার সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর দায়িত্বও তিনি নির্দ্বিধায় পালন করেছেন। তথাকথিত নাস্তিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্ব’ বা লিবারেশন থিওলজীর প্রচারক হয়েছিলেন। সংকীর্ণ, যান্ত্রিক ও রিপুসর্বস্ব ফ্রয়েডিয় মনস্তত্বকে বস্তুবাদী দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত পাভলভীয় মনস্তত্ত্ব দিয়ে এদেশে প্রতিস্থাপিত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। বস্তুবাদী হয়েও কিভাবে ‘অদৃষ্টবাদী’ ও ‘নিয়তিবাদী’ হওয়া যায়, সেই হেয়ালীর ব্যাখ্যাও আমরা তার কাছ থেকে পাই। একাডেমিক বুদ্ধিজীবিদের মত জ্ঞান অন্বেষায় তিনি মার্কস-বিশেষজ্ঞ (Marxologist) হননি। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসাবে সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর তিনি পার্টি বিলোপের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। জ্ঞান, শিক্ষা তাঁর কাছে বিতরণযোগ্য জিনিষ নয় বরং পারস্পরিক আদান-প্রদানে অর্জনের বিষয়।

রবীন্দ্রনাথের মত তিনিও গাম্ভীর্যকে নির্বোধের মুখোশ মনে করে সবার সঙ্গে কৌতুক ও হাস্যরসের সহযোগে গুরুগম্ভীর বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করতেন। ফলে ‘গল্পে গল্পে ব্যাকরণ’, ‘ব্যাকরণে ভয় অকারণ’ নামক বইয়ে তিনি কাটখোট্টা নিরস ব্যাকরণকেও আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে। তাঁর হাস্যরসের সবচেয়ে বহুল প্রচলিত মন্তব্য হল—মাইকে বিভ্রাট হলে বলা ‘মাইক লাগবে না, আমি অমায়িক’।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ডি ডি গোস্বামী, রেবতী বর্মন, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, সরদার ফজলুল করিম—এদের এই সর্বশেষ উত্তরসূরির মহাপ্রস্থান ঘটলো। মৃত্যুকে অমোঘ ভেবে তা সহজভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা আমরা তাঁর কাছ থেকে পাই। তাই তাঁর মৃত্যুতে শোক নয়, জানার ও অনুশীলন করার শক্তিতে বলিয়ান হবার প্রতিজ্ঞা করা জরুরি। তবে এই নিঃস্বতায় দুঃখ একটাই—তাঁর চিন্তা ও তৎপরতার কোনো উত্তরাধিকার এখন আর রইল না। কিন্তু এটাও নিশ্চিত যে আমাদের মননভূমিতে যে কর্ষণ তিনি করেছেন, তা থেকে নব নব বিপ্লবী চৈতন্যের অঙ্কুর উত্থিত হবেই। কমরেড যতীন সরকার লাল সালাম।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice