ছায়াছবি
এক বন্ধুর মুখে এ-গল্প শোনা।
আমার বন্ধুটি অনেক দেশ বেড়িয়েছেন, লোক হিসেবে অমায়িক, রসিক ও শিক্ষিত। কলকাতাতেই থাকেন।
যখন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয় তখন গল্পে-গল্পে অনেক সময় সারারাত কেটে যায়।
প্রকৃতপক্ষে ঠিক মনের মতন লোক পাওয়া বড়ো দুষ্কর। অনেক কষ্টে একজন হয়তো মেলে। অধিকাংশ লোকের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়, সে সম্পূর্ণ মৌখিক। তাদের সঙ্গে আমাদের হয়তো ব্যক্তিগত অভ্যাসে, চরিত্রে, মতে, ধর্মবিশ্বাসে, বিদ্যায় যথেষ্ট তফাত। কিন্তু একই অফিসে কী কলেজে কী কোর্টে একসঙ্গে কাজ করতে হয়, দু-বেলা দেখা হয়; দাদা কিংবা মামা বলে সম্বোধন করতে হয়, কৌটাস্থ পানের খিলির বিনিময়ও হয়তো হয়ে থাকে— কিন্তু ওই পর্যন্ত। মন সায় দিয়ে বলে না তার সঙ্গে দু-বেলা দেখা হলে গল্প করে বাঁচি। কোনো নিরালা বাদলার দিনে অফিসের হরিপদদার সঙ্গ খুব কাম্য বলে মনে হবে না।
আমার বন্ধুর নাম— থাক গে, নামের দরকারই বা কী? আবার লোকে তাঁকে বিরক্ত করবে। কৌতূহলী লোকের সংখ্যা সর্বত্রই বেশি। কোনো কাজ নেই, গিয়ে আনন্দ করবে আর বকবক করে বকাবে। তিনি একজন শিক্ষিত ব্যক্তি এবং একজন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী, হাতে পয়সা এবং কলকাতায় বাড়ি আছে। বাড়ির গ্যারেজে মোটর গাড়ি থাকবার অন্য কোনো বাধা ছিল না, কিন্তু আমার বন্ধু আড়ম্বর ও বিলাসিতা পর্যন্ত করেন না।
ভূমিকা এই পর্যন্ত।
সেদিন খুব বর্ষার দিন। একা বাড়ি বসে বসে ভালো লাগল না। একখানা ট্রেন ধরে কলকাতায় পৌঁছলাম। ভীষণ বর্ষায় ট্রাম বন্ধ। বাস ক্বচিৎ দু-একটা চলছে। জল ভেঙে হেঁটে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম।
বন্ধু আমায় দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন বলাই বাহুল্য। তখনি গরম চা ও খাবারের ব্যবস্থা হল। পরস্পরের কুশল জিজ্ঞাসার ভদ্রতা বাদ গেল না। তাঁর বৈঠকখানার গদি-আঁটা আরামকেদারায় ততক্ষণে বেশ হাত-পা এলিয়ে বসে পড়েছি।
সন্ধ্যার পরে আবার সজোরে বৃষ্টি নামল। বেশি ঠান্ডা বোধ হওয়াতে পাখা বন্ধ করতে হল।
বন্ধুর আতিথেয়তা আমার সুপরিচিত। তিনি বললেন— ঘরে স্টোভ আছে, চলুন দোতলার ঘরে। এই বৃষ্টিতে আর কেউ আসবে না। খিচুড়ি চড়িয়ে দিই। ডিম আছে, আলু আছে—
—চমৎকার!
—মাছ দেখতে পাঠাব রঘুয়াকে?
—কোনো দরকার নেই। আমাদের ওতেই হয়ে যাবে।
—চলুন ওপরের ঘরে। রাতে এখানে খাবেন এবং থাকবেন।
—নইলে আর যাচ্ছি কোথায়?
—যেতে চাইলেও যেতে দেওয়া হবে না।
ওপরের বসবার ঘরটিতে বন্ধুর লাইব্রেরি। দেওয়ালের গায়ে সারি দেওয়া কাচের আলমারি, সাধারণত বিজ্ঞান ও ইতিহাসের বইয়ে ভরতি। দেয়ালে বড়ো বড়ো অয়েল পেন্টিং, প্রতিকৃতি নয়— সবই ল্যান্ডস্কেপ। ভালো চিত্রকরের হিমালয় অঞ্চলের দৃশ্য। আমার বন্ধু হিমালয়কে অত্যন্ত ভালোবাসেন। হিমালয় অঞ্চলের ভৌগোলিক তত্ত্ব তাঁর নখদর্পণে। অনেকদিন রাত্রে হিমালয় ভ্রমণের নানা মনোরম গল্পে কখন রাত্রি কেটে গিয়েছে, টেরও পাইনি।
ওপরের ঘরে যখন গিয়ে বসলুম, তখন টেবিলের ওপর একখানা ছবিওয়ালা বই খোলা পড়ে আছে। বন্ধু হাতে নিয়ে বললেন— এখানা দেখেছেন? হিমালয়ান জার্নাল। স্যেন হেডিনের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত বেরিয়েছে।
—কোথাকার?
—কাশ্মীর।
—এমন শৌখিন স্থানে স্যেন হেডিন বেড়াতেন বলে জানতাম না। কোথায় তাকলা মাকান, কোথায় কারাকোরাম— এ সব দূর দুর্গম স্থান ছাড়া তিনি—
—না। চমৎকার দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন এ-লেখাটায়, দেখবেন।
—দেখবার চোখ ছিল ভদ্রলোকের— যা সকলের থাকে না।
—এক-শো বার সত্যি।
তারপর আমাদের গল্প আরম্ভ হল প্রধানত কাশ্মীর নিয়েই। কাশ্মীর আমার বন্ধুটির জীবনের একটি তীর্থক্ষেত্র, অনেকবার তিনি ক্লান্ত নাগরিকের মন ও চক্ষুকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য দেশ-বিদেশে ভ্রমণে বেরুতেন; আমি জানি।
কাশ্মীরেও গিয়েছেন অনেকবার। কাশ্মীরের কথায় সাধারণত তিনি পঞ্চমুখ হয়ে পড়েন। এবার কিন্তু একটা নতুন বিষয় নিয়ে কথা পাড়লেন। সেটা হল তাঁর একটি অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা, সেটা কাশ্মীরের পথেই ঘটেছিল।
বন্ধু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments