বিদেশী ছোটগল্প প্রসঙ্গে
শুধু বৃহত্তর ইউরোপে নয়, সমগ্র পৃথিবীর সাহিত্যানুরাগীদের কাছে মৌলিক, সহৃদয় ও বুদ্ধিদীপ্ত এক বিশ্লেষণে দস্তয়েভ্স্কিকে উপস্থিত করেছিলেন অঁদ্রে জিদ্। বলা যেতে পারে, পরবর্তীকালের দস্তয়েভ্স্কি ও রুশ সাহিত্যের ব্যাপক চর্চার মূলে আছে জিদের ওই অসাধারণ স্টাডি।
‘দস্তয়েভস্কি’-শীর্ষক গ্রন্থে সংকলিত বক্তৃতামালার এক জায়গায় জিদ্ বলেছেন: আমরা অর্থাৎ ফরাসীরা ফর্মুলা শুনতে ও প্রয়োগ করতে ভালবাসি। একজন লেখককে মার্কা দিয়ে শো-কেসে সাজিয়ে রাখার এটি একটি সহজ পথ। সহজে মনে রাখা যায় এমন তথ্যই আমরা চাই। আলাদা করে মাথা খাটাতে কে আর পছন্দ করে। ফর্মুলাগুলি এইরকম—। নীৎশে? দাঁড়াও বলছি, নীৎশে হল ‘দি সুপারম্যান। বি রুখলেস। লিভ ডেঞ্জারাসলি।’ তলস্তয় ‘নন-রেজিসটান্স টু ইভিল।’ ইবসেন? ‘নর্দার্ন মিস্টস।’ ডারউইন? ‘বাঁদর থেকে মানুষ এসেছে।’
ফরাসীদের স্বভাব নিয়ে জিদ্ যা বলেছেন তা বোধহয় পৃথিবীর যে-কোনো এলাকার মানুষদের সম্পর্কেই খেটে যায়। শুধু নীৎশে, তলস্তয়, ইবসেন এবং ডারউইনই নন, ভুবনবিখ্যাত সব ব্যক্তিত্বকে ব্যাখ্যা করার জন্যে এই ধরনের এক-এক লাইনের ফর্মুলা চালু আছে।
বর্তমান সংকলনের বত্রিশজন লেখকও এইসব ফর্মুলার হাত থেকে রেহাই পাননি। কিন্তু ফর্মুলা শেষ পর্যন্ত ফর্মুলাই। সাহিত্যরস বা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। একজন প্রকৃত সাহিত্যপাঠক ‘এক-কথার’ অর্ধসত্য এইসব ফর্মুলাকে এক কথাতেই নাকচ করে দেন। কারণ, সাহিত্য আর যাই হোক না কেন পরের মুখে ঝাল বা মিষ্টি খাওয়া নয়। সুসাহিত্যের পঠন ও পুনর্পঠনে নতুন-নতুন মাত্রা বেবিয়ে আসে ক্রমাগত।
এই জন্যেই বোধহয় দস্তয়েভস্কির সঙ্গে রেমব্রাস্টের তুলনা টেনেছেন জিদ। আগাগোড়া মজার ঘটনায় ঠাসা হলেও গোগলের ‘পাগলের দিনলিপি’ হয়তো এই কারণেই কারও-কারও কাছে আশ্চর্য এক করুণ কাহিনী। কয়েকজন সমালোচকের মতে চেকভের ‘ডার্লিং’ এক আদর্শ সুখী মেয়ের গল্প, কিন্তু তলস্তয় এর মধ্যেই আবার ‘অ্যান্টি-ফেমিনিস্ট’ তত্ত্ব খুঁজে পেয়েছেন। সাহিত্য বহুমাত্রিক, নানা কোণে তার নানা দ্যুতি। পাঠকমাত্রই এখানে আবিষ্কারক হতে পারেন।
সাহিত্যে শুধু মানুষই নয়, স্থান ও বস্তুও সজীব চরিত্র হয়ে ওঠে অনেক সময়। সেন্ট পিটার্সবুর্গ এইরকমই এক শহর। রহস্যময় এই শহরকে নানা চেহারায় দেখেছেন পুশকিন, গোগল, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেকভ প্রমুখ লেখক। পুশকিনের কাছে পিটার্সবুর্গ অলৌকিক এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কহীন এক শহর। গোগলের কাছে এটি ‘স্বপ্নের কবরখানা’। এই শহরের মায়াময় স্পর্শহীনতা, কুয়াশা আর চাঁদনি রাত থেকেই দস্তয়েভস্কি গড়ে তুলেছেন তাঁর রচনার বিচিত্র পরিমণ্ডল। নিছক পরিপ্রেক্ষিত নয়, বিভিন্ন রুশ লেখকের হাতে শহর পিটার্সবুর্গ আলাদা-আলাদা চরিত্র হয়ে উঠেছে।
জেমস জয়েস একবার বলেছিলেন, “আমি শুধু ডাবলিন নিয়েই লিখতে চাই। কারণ, ডাবলিনের হৃদয় স্পর্শ করতে পারলে আমি পৃথিবীর সব শহরের হৃদয় স্পর্শ করতে পারব।” কথাটির মর্মে আছে সর্বজনীন এক সত্য। এক শহর আর এক শহরের হৃদয়ের ভাষা বোঝে। এই ভাবেই বোধহয় পিটার্সবুর্গের মনের কথা বুঝতে পারে ডাবলিন। ডাবলিনের কথা আবার পৌঁছে যায় লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন, নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি শহরে। শহরে-শহরে কথা বিনিময় হয়। শেষে সব কথা ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। শহর আর গ্রামের মধ্যে তখন আর কোনো ভেদরেখা থাকে না। শেষ সত্য সেই সাহিত্য ও তার রসিক। ভৌগোলিক সীমারেখা, ভাষা ও কালের ব্যবধান কোনো বাধা হয়ে উঠতে পারে না এখানে।
গল্প শুনতে ভালবাসে না—এমন মানুষ বোধহয় পৃথিবীতে কখনো ছিল না, আজও নেই। গল্পকথাই বোধহয় পৃথিবীর প্রাচীনতম আর্ট। সুপ্রাচীন মিশর, গ্রীস, বোম ও ভারতের উপকথা, লোকগাথা ইত্যাদি তো গল্পের উৎসভূমি। পারস্য বা আরব্য রজনীর মায়া তো ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সব প্রান্তের রজনীতে। বাইবেলের এক-একটি কাহিনী তো এক-একটি অপরিস্রুত ছোটগল্প। মধ্যযুগের ইতালীয় নভেলা তো নতুন এক আর্টফর্মে’র দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। সেই পথেই পড়েছে চসারের ক্যান্টারবেরি টেল্স। গল্পের আদিভূমি থেকে যাত্রা শুরু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments