পাণিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ
সামান্য একজন দোকানদার হিমু। রেওয়ারীতে তাঁর বাবার মুদিখানার দোকান ছিল সত্যি সত্যিই। সেই অবস্থা থেকে যে তিনি একদিন আদিল শা শূরের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠবেন, তা কে ভেবেছিল!
শুধু কি প্রধানমন্ত্রী। বলতে গেলে তিনিই আদিলের রাজ্য শাসন করতেন। শেরশাহের পুত্রের মৃত্যুর পর তাঁর শিশুপুত্রকে বধ ক’রে যে সুরবংশ রাজ্য অধিকারের চেষ্টা করে তাদের মধ্যে সিকান্দার, ইব্রাহিম ও আদিল শা এই তিনজনে বলতে গেলে রাজ্যটা ভাগাভাগি ক’রে নিয়েছিলেন। তার মধ্যে পাঞ্জাবের সিকান্দার সুরকে পরাজিত ক’রেই হুমায়ূন দিল্লী পুনরধিকার করেন। বাকী দুজনকে পরাজিত করার ওঁর আর অবসরই হ’ল না—দিল্লী প্রাসাদে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে বেচারী মারা গেলেন।
এঁদের মধ্যে আদিল ছিলেন নামে রাজা কিন্তু তিনি একেবারেই অকর্মণ্য ছিলেন। হিমুই ছিলেন আসল শাসক। হয়ত হিমুর নিজেরও একটা উচ্চাশা ছিল—ভেবেছিলেন ভারতে আবার হিন্দু-সাম্রাজ্য স্থাপনের আশা খুব অসম্ভব নয়। কিন্তু হুমায়ুনের আগমনে তাঁর দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। যদিও আকবর বালক কিন্তু তাঁর অভিভাবক বৈরাম পাকা লোক। সুখ-দুঃখে বহুকাল তিনি হুমায়ূনের অন্তরঙ্গ ও বিশ্বাসী অনুচর ছিলেন। দুঃখে পোড় খেয়ে খেয়ে বহু অভিজ্ঞতাই তিনি সঞ্চয় করেছেন। সেনাপতি হিসাবেও তাঁর খ্যাতি কম ছিল না। সুতরাং বৈরাম পাঞ্জাবে পাকাপাকি ভাবে বসতে পারলে তাঁকে হঠানো কঠিন হবে, বরং তিনিই হয়ত একদিন হিমুকে হারিয়ে দেবেন। অন্তত সে চেষ্টা তো নিশ্চয়ই করবেন—এই ভেবে হিমু আর বৈরামকে নিঃশ্বাস ফেলবার অবকাশ দিলেন না, বিরাট এক বাহিনী সংগ্রহ ক’রে যুদ্ধযাত্রা করলেন।
হিমু প্রথমেই আগ্রা ও দিল্লী দখল করলেন। আকবর সে সময়ে থাকেন লাহোরে, সেখানেই তাঁকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করা হয়েছে, দিল্লীতে এসে বসবার তখনও অবসর পান নি। দিল্লীর শাসনভার ছিল তারদি বেগ বলে একজনের ওপর। তারদি হিমুর সেই বিপুল বাহিনীর সামনে দাঁড়াতে পারলেন না, দিল্লী ত্যাগ ক’রে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। দিল্লী রক্ষার ভার তাঁর ওপর ছিল অথচ তিনি তা রক্ষা করতে পারেন নি—কাজের এই গাফিলতির জন্য বৈরাম তাঁর প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন।
যাই হোক্—এধারে হিমু দিল্লী দখল ক’রে নিশ্চিন্ত হলেন না কিংবা বৈরামের তরফ থেকে আক্রমণের অপেক্ষাও করলেন না। তিনি সসৈন্যে এগিয়ে চললেন লাহোরের দিকে। তবে বেশী দূর তাঁকে যেতে হ’ল না, মাত্র কয়েক বৎসর আগে যে পাণিপথে বাবর ইব্রাহিম খাঁ লোদীর কাছ থেকে ভারতের সিংহাসন কেড়ে নিয়েছিলেন, সেই পাণিপথেই বাবরের পৌত্রের প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হ’ল।
বৈরাম খাঁ প্রস্তুত হবার বেশী সুযোগ পান নি এটা ঠিক—লোকবল নেই, অর্থবল নেই—তখনও পর্যন্ত চারিদিকেই বিশৃঙ্খলা। হুমায়ুন মারা গেছেন তখনও ছ’মাস হয় নি, এরই মধ্যে অতবড় শত্রুর সম্মুখীন হওয়া, প্রায় পরাজয় নিশ্চিত জেনেই এগিয়ে যাওয়া। তবু বৈরামের এত মনের জোর ছিল যে, তিনি এতটুকুও ইতস্তত করলেন না এবং হিমুকে এগিয়ে আসতেও অবসর দিলেন না। নিজেই এগিয়ে এসে হিমুর সঙ্গে যুদ্ধ করলেন।
পাণিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধেও প্রথম যুদ্ধেরই পুনরাভিনয় হল। হিমুর সৈন্যসংখ্যা অগণিত, সে তুলনায় বৈরামের শক্তি-সামর্থ্য নগণ্য। তার ওপর ইব্রাহিমের মতো দুর্বল সেনাপতি ছিলেন না হিমু, তাঁর সৈন্যবাহিনীর মধ্যেও বেশ শিক্ষা ও শৃঙ্খলা ছিল। সুতরাং বৈরামের সেদিন যুদ্ধজয়ের কোনও আশাই ছিল না—ছিল শুধু ভাগ্যের ওপর ভরসা।
সেই ভাগ্যই সেদিন আকবরের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অদ্ভুত খেলা খেলল। হিমু তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলবার উদ্দেশ্যে, মধ্যের ব্যূহ স্থির রেখে আর দুটি দল পাঠিয়ে দিলেন বিপক্ষদলের দুপাশ থেকে আক্রমণ করবার জন্য। সামনের দল তখনও আক্রমণ করল না এই জন্য যে, ওধারের আক্রমণে শত্রুপক্ষ যখন দুর্বল হয়ে আসবে, তখনও তাঁর বাহিনীর এই পুরোভাগ থাকবে অক্ষত ও অক্লান্ত, সেই সময় এদের একটা আক্রমণ হ’লেই শত্রু একেবারে অভিভূত হয়ে পড়বে,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments