১৯১৭–১৯৯৮
শওকত ওসমান
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
See more >>-
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন অঙ্গাঙ্গী জড়িত। দেখা গেছে রাজনৈতিক কিছু মুনাফা আদায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আবার শেষোক্ত আলোড়ন উপরি উপরি যাই হোক, তার দীর্ঘ মেয়াদী উদ্দেশ্য কিন্তু রাজনৈতিক। বাংলাদেশে এখনকার প্রবণতার হেতু সন্ধানের জন্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটভূমি-সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।
অনেকে তো পাকিস্তানের জন্মলগ্ন নিজের নাড়িতেই অনুভব করেছেন।
তাঁদের জন্যে বেশী কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু অনেকের জ্ঞান কেবল ইতিহাস মারফৎ। তাই অতীতের কবর আবার নতুন করে খুঁড়ে দেখতে হয়।
পাকিস্তান গঠিত হয় দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর। মুসলমানরা এক জাতি, যেহেতু তাদের ধর্ম এক। মোদ্দা কথা এইখানে এসে দাঁড়ায়। ধর্মকেই জাতীয়তা গঠনের একমাত্র উপাদান-রূপে তখন মুসলিম লীগ প্রচার করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের
-
দাঁড়াও, পথিকবর।
এই দেশে ত তোমার জন্ম। একবার দাঁড়াও। একটু দাঁড়াও। তুমি ত সীমার নও। কারবালার যুদ্ধের পর ইমাম হোসেনের কাটা শির নিয়ে দামেস্ক নগরীর দিকে ধাইছ। হঠাৎ এসে পড়েছো। কেউ ত এদিকে আসে না। যখন এসে পড়েছ, একটু দাঁড়াও।
আমি জানি, কেন এমন বে-পথে তুমি এসেছ। বন-জঙ্গলের পথে কেউ হাঁটে না। কিন্তু বাঙলাদেশের মোহিনী মায়া সকলকে টেনে নিয়ে যায়। আর তোমার জন্ম ত এই বঙ্গে। তুমি বে-পথু হবে, তা আর আশ্চর্য কী?
কতো দরিদ্র আমাদের গ্রাম। কী আছে মানুষের সম্পদ? একটা খড়ো ঘর বা কুটির। এক চিলতে উঠান। হয়ত কয়েকটা কলাগাছ বা বাঁশগাছ বাস্তুর ধারে। দুনিয়ার দৌলত নেই। সেই
-
বারুদের গন্ধ আর ভাল লাগে না।
ক্যাপ্টেন বশীর নিজের মনে বিড়বিড় করলে। মহকুমা কাচারির পাশেই এই বিল্ডিং সে অফিস বানিয়ে নিয়েছিল গত চার মাস। এলাকার লোক শান্তিপ্রিয়। তেমন কোন গোলমাল করেনি কেউ। ‘সব সাচ্চা মুসলমান। সবাই পাকিস্তান চায়। এই দিক থেকে ক্যাপ্টেন বশীর নিশ্চিন্ত ছিল। মাঝে মাঝে গোয়েন্দারা দু’চারটে কালো ভেড়ার খবর আনত, তাদের রাস্তার কাঁটার মত সরিয়ে ফেলতে বেশী দেরী হোত না। গেরেপ্তার করে নিয়ে আসা এবং দিন শেষ হওয়ার যা অপেক্ষা। অন্ধকারে তারপর পাকিস্তান-বিরোধী নিমকহারামদের আর কোন নাম-নিশানা থাকত না দুনিয়ায়। বিলম্ব অথবা প্রকাশ্যে শাস্তি দিলে ফল খারাপ হয়, তা ক্যাপ্টেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছিল এই এলাকায় নয়,
-
একটিবার দৌড় দিতে পারতাম।
এই আফশোসটুকু বারবার নাজেমের মনে আঘাত করতে লাগল।
কিন্তু তা আর এ জন্মে সম্ভব নয়। ডান হাত এবং বাম উরুর দিকে তাকিয়ে নাজেম সিদ্ধান্ত আর একবার মৌরসী করে নিলে। নিজে ঘাড় দুলিয়ে সমর্থন জানাতে অস্ফুট উচচারণের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্ধকারে গুলি কী ভাবে তার উরুর উপর লাগল সে বুঝতে পারেনি। তবে কি সাবেক অভ্যেস অনুযায়ী সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল গুলি চালানোর সময়? “রাইফেল নিয়ে বুকে হামাগুড়ি সহযোগে সব সময় এগোনো বা পেছানো উচিত, যদি শত্রুর এলাকায় এসে পড়ো বা অপারেশান শুরু হয়ে যায়, কখনও দাঁড়াবে না বা হঠাৎ উঠে দৌড়ানোর চেষ্টা করবে না।” ক্যাপ্টেনের কথাগুলো সাঁইসাই নাজেমের
-
পাটের গুদামে আগুন লেগেছিল। বিরাট টিনের শেডের নীচে হাজার হাজার গাঁট স্তূপ। কিভাবে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়, তা কেউ বলতে পারবে না। চারিদিকে আগুনের লকলকে জিভ যখন সব চেটেপুটে ছাই করে দিতে বেরিয়ে আসছিল, তখনই খবর পাওয়া যায়। ফায়ার ব্রিগেডে খবর পৌঁছতে বেশী দেরী হয়নি।
দমকল বাহিনী লড়ায়ে নেমে পড়েছিল যেন শত্রু পক্ষ আর এগুতে না পারে। কাছেই নদী। সুতরাং গোলাবারুদের অভাব হয়নি। হোস পাইপের ভেতর দিয়ে পানির ফোয়ারা কামানের গোলার মত ছিটিয়ে পড়ছিল।
কিন্তু এই শত্ৰু তো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। তাই ফায়ার ব্রিগেডের সৈন্যসামন্তরা স্থির করেছিল গুদামের চালের একদিক খুলে উপর থেকে পানি মারার বন্দোবস্তই যুক্তিযুক্ত।
কয়েকজন ফায়ারম্যান সিঁড়িযোগে চালে
-
ভূমিকা
ঘটনাটা ঘটেছিল খ্ৰীষ্ট্রীয় ১৯৬৫ সনে হিন্দুস্থান—পাকিস্তান যুদ্ধের সময়।
ঠিক আট বছর পূর্বে।
ধাতুদৌর্বল্য রোগের মত বাঙালীদের মধ্যে স্মৃতিদৌর্বল্যের প্রাদুর্ভাব। তাই আমার কাহিনীর পুনরাবতারণা। নচেৎ নতুন করে কিছুই বলার প্রয়োজন ছিল না।
প্রথমে যে থলির মুখ খুলে দিয়েছিল এবং যার ফলে বাতাস তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে বাঙ্গালীর কানে সেঁধোয় তার নাম সৈয়দ আলী মজুমদার, সামরিক পেশায় ক্যাপ্টেন এবং অবসরকালে আমার বন্ধু।
মজুমদারকে নতুন করে স্মরণ করতে হয়। কারণ সে না বললে আমি আর কোথা থেকে জানতাম? আমি শোনার পরে আরো বন্ধুদের না বলে চুপ থাকতে পারিনি। তাদের মুখে মুখে গোটা বাংলাদেশ ঘোরা হয়ে যায়। এক কান থেকে দু’কান ৷
-
স্বাধীনতার দামামার শব্দে উত্তরঙ্গ গোটা বাংলাদেশ।
বাড়ীর উঠানে ঢুকতেই মা হঠাৎ ঘোমটা টেনে বসল। ঝোপ দাড়ীওয়ালা কোন বেগানা মরদ অন্দরে ঢুকে পড়েছে। তৌবা !
লাতু তখনই হো হো শব্দে হেসে উঠল এবং দৌড়ে গিয়ে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরল, সাথে সাথে উচ্চারণ “মা আমারে চিনত৷ পারলে না? আমি লাতু—।”
হাউমাউ কান্নাসহ সন্তানকে বুকে চেপে জননী কী যে বলতে লাগল বুঝা গেল না। এই নাটকীয় মঞ্চে তখন আরো দর্শক জুটে গেছে। লাতুর ছোট ছোট দুই বোন, বারো বছরের এক ভাই। তারা হকচকিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ মার কান্না, এক অপরিচিত মিলিটারী যদিও মুক্তিযোদ্ধা, অমন কোলাকুলি। সবই অভাবনীয়। তখনই বাপ জবেদ মিয়া কোথা থেকে যে
-
চোখের উপর একটু আলতো হাত বুলাতে পারলেও যেন এখন কিছুটা যন্ত্রণার উপশম হতো।
অসহ্য অস্থিরতা ভেতরে ভেতরে এত ঘুরপাক রত যে, সালামৎ আলী ঠিক হদিস করতে পারছিল না। এই মুহুর্তে যথা-প্রতিষেধ তার জন্যে কী আছে। হঠাৎ-ই মনে পড়ল অমন করস্পর্শের কথা, যদিও সচেতনভাবে কিছু নয়।
প্রতিবর্তী ক্রিয়া হিসেবে হাত তুলতে গিয়ে সালামৎ নিদারুণভাবে অনুভব করলে, তার যো নেই।
হাতকড়ার শাসন ধমকে সব ঠাণ্ডা করে দিল।
কিন্তু সালামৎ সহজে পেছপা হয় না। মাথা নিয়ে গেল সে নিজের হাতের চেটোর মধ্যে। সেখানে দুই ফেটি-বাঁধা চোখ ঘষতে লাগল।
হঠাৎ তার এমন নত মুখ পাঞ্জাবী প্রহরীর চোখ এড়ায় নি। সে ব্যাপারটা দেখেই চুপ করে
-
আর থোড়া অক্ত।
আর কিছু সময়।
অনন্তের সুড়ঙ্গে এই হামাগুড়ি আর কতক্ষণ দেওয়া যায়?
সোলেমান সারেঙের কাছে তখন কি প্রশ্ন বার বার ঘাই মেরেছিল, তা আজ জানার কথা নয়।
কারণ, মুহূর্ত নির্যাস হয়ে এলে অনেক ছবি, অনেক কথা, ঘটনা একাকার যে রূপপরিগ্রহ করে তা নিতান্ত অনুভবের ব্যাপার। ক্যামেরার লেস অতি দ্রুত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একই ফিল্মের সমতলে নানা ছাপ সংগ্রহ সহজ। তার পাঠ উদ্ধারও সম্ভব। সেখানে একক ছবি ছাড়া আর কিছু নেই।
কিন্তু ঘটনা আবেগ-প্রবাহ যখন তেমন কায়দায় গতির চোটে একটার পর একটা—একটার ভিতর একটা সেঁধিয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বতন্ত্র জানান দেওয়ার দাবি হাঁক-ফুকর ছড়াতে থাকে, তখন অর্থহীনতার কাছে সব
-
সে ভেসে চলেছিল।
পঞ্চভূত এখনও তার সহায় হয়নি। শুধু বাতাস আর জলের সাথে সে এগিয়ে চলেছে। স্রোতের টান মৃদু। বাতাসের আমেজ ঝিরিঝিরি ৷ বাইরের জগতে কোন তাড়াহুড়৷ নেই। আর যে ভাসছে, তার কাছে গতি এখন অর্থহীন। শ্লথ বা দ্রুত—কী আসে যায়। মহাকাল সামনে পড়ে আছে। বেসবুর হওয়ার প্রয়োজন অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। বুকে যখন বাতাস থাকে, তখন বাইরের বাতাসকে জমা খরচের হিসেবে আনা যায় ৷ আজ সব হিসেব-নিকেশ আগামী ইতিহাসের কাছে তুলে দিয়ে সে পরম নিশ্চিন্ত।
সে ভেসে চলেছে।
সটান চিৎশায়িত। মুখ আকাশের দিকে। চোখ নেই। দাঁড় কাক দু'তিন দিন ধরে তা খুবলে খুবলে খেয়ে শেষ করেছে। কারণ, চোখের মালিকের
-
মেয়েটা আর হাঁটতে পারছিল না।
অনেক আগেই বাপ তার ক্লান্তি লক্ষ্য করেছে। আগে তবু সে পায়ে পায়ে চলার তাল ঠিক রাখছিল। নিজে যেমন জোর দেয়, কন্যাও তেমন গতি দ্রুত করে। কিন্তু তার পক্ষেও সামাল দেওয়া অত সহজ নয়। পয়ষট্টি বছর বয়সে গায়ে আর কতো তাগত থাকে? যা ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। তবু যে সে মাটির উপর পা ফেলে ফেলে এগোতে পারছিল, তা কম আশ্চর্যের ব্যাপার নয়।
চিন্তার সময় আর কোন এক সময়ে পাওয়া যাবে। এখন শুধু পথের দূরত্ব শেষ করে আনাই একমাত্র উদ্দেশ্য। কারণ, আবার কখন শত্রু ধাওয়া করবে, কে জানে? এই শত্রু আশপাশের কোন ডাকাত নয়। ডাকাতেরও ভয়
Page 1 of 1
ক্যাটাগরি
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.










