দুই ব্রিগেডিয়ার
পাটের গুদামে আগুন লেগেছিল। বিরাট টিনের শেডের নীচে হাজার হাজার গাঁট স্তূপ। কিভাবে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়, তা কেউ বলতে পারবে না। চারিদিকে আগুনের লকলকে জিভ যখন সব চেটেপুটে ছাই করে দিতে বেরিয়ে আসছিল, তখনই খবর পাওয়া যায়। ফায়ার ব্রিগেডে খবর পৌঁছতে বেশী দেরী হয়নি।
দমকল বাহিনী লড়ায়ে নেমে পড়েছিল যেন শত্রু পক্ষ আর এগুতে না পারে। কাছেই নদী। সুতরাং গোলাবারুদের অভাব হয়নি। হোস পাইপের ভেতর দিয়ে পানির ফোয়ারা কামানের গোলার মত ছিটিয়ে পড়ছিল।
কিন্তু এই শত্ৰু তো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। তাই ফায়ার ব্রিগেডের সৈন্যসামন্তরা স্থির করেছিল গুদামের চালের একদিক খুলে উপর থেকে পানি মারার বন্দোবস্তই যুক্তিযুক্ত।
কয়েকজন ফায়ারম্যান সিঁড়িযোগে চালে উঠে দমাদ্দম নাটবল্টু খুলে টিন টেনে আলগা করতে লাগল। কেউ কেউ ভেতরে হোস পাইপ ঢুকিয়ে পানি মারতে শুরু করলো।
কিন্তু আগুনের গোস্সা যেন সেদিন আর থামতে চায়নি। চালের ক্রমশ তেতে ওঠা টিনগুলো পর্যন্ত আগুনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। রাগ কি কম। ফটফট শব্দে চাল ছাড়া হওয়ার উপক্রম। কোথাও কোথাও নীচে কাঠের আড়া পুড়ে বা ঝলসে গেছে। সুতরাং টিন আর নিজের জায়গায় থাকতে চাইবে কেন?
এই ক্ষেত্রে যে-সব ফায়ারম্যান চালের উপরে উঠেছে তাদের সমূহ বিপদ। কয়েকজন ফায়ারম্যান আগুনের তাপ আর ধোঁয়ার মধ্যে তখন যেন সিলুয়েট ছবি অথবা নড়াচড়া-রত প্রেতের দল।
গাঁটের ভেতর হয়ত কিছু ভিজে পাট ছিল। ফলে, ধোঁয়া উঠতে লাগল রাশরাশ। সব কুণ্ডলী পাকানা অজগর। ফুঁসে উঠেনি, পাঁয়তারা করছে।
কিন্তু সাবাস, অগ্নিসৈনিকের দল। অফিসারের আদেশ পালন করছে বটে। কেউ একচুল এদিক ওদিক নড়ছে না। অবিশ্যি পরিস্থিতি বিষম। ক্রমশ আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগুন এবং পানিতে যেন বক্সিং লড়ছে অথবা কুস্তি। মাঝে মাঝে একে অপরের কোমর জাপটে পাছড়াপাছড়ি শুরু করে দিয়েছে।
কট-ট-ট...
শব্দ হচ্ছে নাট-বল্টু খুলে যাওয়ার। শব্দ শুধু হিসহিস হোস পাইপের শীর্ষ ধ্বনি।
মানুষের দিক স্তব্ধ। দাঁতে দাঁত কামড়ে তারা দুশমনের মোকাবিলা-রত। হঠাৎ সেই দোজখের কড়ার ধোঁয়া এবং আগুনের ঝলকের মধ্যে থেকে যেন গায়েবী আওয়াজের মত নির্দেশ হেঁকে উঠল, “ফায়ার মেন গেট ডাউন—নেমে পড়ো, নেমে পড়ো।”
একজন অফিসারও টিনের চালে উঠেছিলেন দুশমনের গতিবিধি দেখে অপারেশনের লাইন ঠিক করতে। বোঝা গেল, রণ-কৌশল বদলাতে হবে।
নীচে আরো দু’জন জুনিয়র অফিসার ছিল। সিনিয়র চালের উপর। হুকুম তিনিই দিচ্ছেন।
কিন্তু যিনি গায়েবী আওয়াজ ছাড়লেন, তিনি কোথায়? “ফায়ারম্যান, গেট ডাউন।” শব্দ বেরুল। শব্দের উৎস কোথায়? তা আর দেখা যায় না।
ধোঁয়ার পুরু ঘন কুণ্ডলীর মধ্যে চোখের কোন দাম থাকে না। শব্দের উৎস কোথায়?
নীচে আগুনের মোকাবিলা চলছিল। আগেকার কায়দা অনুযায়ী।
কিন্তু সমস্ত ফায়ারম্যান জুনিয়র অফিসার সমেত তখন হাঁকাহাঁকি জুড়ে দিয়েছিল, “ভূঁইয়া সাহেব কোথায়? কোথায় ভূঁইয়া সাহেব???”
দুই জুনিয়র অফিসার রীতিমত আর্তনাদ চীৎকার দিতে লাগল, “ভূঁইয়া সাহেব, ভূঁইয়া সাহেব।”
কোন সাড়া মেলে না।
একদিকে দুটো টিন ছিটকে পড়ল।
সমস্ত গুদামের চেয়ে তখন একটি মানুষের কথা বড় হয়ে দেখা দিল। যত লাখ টাকার পাটই থাক, তা একটা মানুষের প্রাণের মূল্যের তুলনায় কিছুই না।
গুদামের নীচে আগুনের কুণ্ডের মধ্যে পড়ে যায়নি ত অফিসার ভূঁইয়া সাহেব?
উদ্বেগ-মথিত চীৎকার চতুর্দিকে, “ভূইয়া সাহেব, মিষ্টার…।”
শোরগোলে স্পন্দিত চতুর্দিক।
গুদামের প্রায় দশ বারো ফিট দূরে ছিল একটা দোতালা টিনের বাড়ী। সেদিকে আগুন ধায়নি। কিন্তু সব ধোঁয়ার তলায় চাপ৷ ৷
হঠাৎ দোতালার বাড়ীর টিনের চালে ধপ ধপ শব্দ উঠল। যেন একটা বানর লাফিয়ে পড়ল ৷
আগুনের হামলা নেই এইদিকে।
খাড়া চাল। উপরে কেবল নাট-বল্টু কিছুটা আঙুল দিয়ে ধরা যেতে পারে। নচেৎ সবই সমতল। আর আছে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments