ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ থেকে ডিসেম্বর ১৯৭১
১৯৭১, ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলা একাডেমীতে শেখ মুজিব আসবেন। সভার সভাপতি কবির চৌধুরী, একাডেমীর পরিচালক। প্রধান অতিথি শেখ মুজিব। লেখকদের পক্ষে বক্তব্য রাখব আমি। সকাল দশটার ভেতর একাডেমীর প্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য। হোটেল পূর্বাণীতে আলোচনা চলছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। লোকজনের ভিতর টানটান উত্তেজনা। লোকজনের ভিতর বৈপ্লবিক পূর্বাভাস। এই উত্তেজনা, এই পূর্বাভাস বুকে ভরে আমি বক্তব্য উপস্থাপিত করলাম: আমরা বাঙালি, শেখ মুজিব আপনি দেশকে স্বাধীন করুন। স্বাধীনতার সঙ্গে কোন আপোস নয়। জবাবে শেখ মুজিব বললেন, আমার ভাই জাহাঙ্গীর যা বললেন তা আমাদেরও কথা। স্বাধীনতাই আমাদের বাঁচার একমাত্র পথ। জয় বাংলা। বিপুল করতালিতে, আগুনের মতো শ্লোগানে ভরে গেল প্রাঙ্গণ।
ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে আমাদের মনে হলো স্বাধীনতা আসন্ন এবং যুদ্ধ আসন্ন।
জঙ্গী লেখকদের একটা সংগঠন দরকার। তাই গঠন করা হলো বাংলাদেশ লেখক শিবির: আমি, হাসান, শামসুর রাহমান, আহমদ ছফা, মুনতাসীর মামুন সমন্বয়ে। অস্থায়ী কার্যালয়: আহমদ ছফার বাসস্থান, তোপখানা রোড। আমাদের পরিকল্পনা হলো: লিফলেট ছাপানো, কাগজ ছাপানো এবং থেকে থেকে শহীদ মিনারে লেখকদের সভা করা। এই উদ্যোগের সেরা উদ্যোগ: শহীদ মিনারে লেখকদের শপথ অনুষ্ঠান। ডক্টর আহমদ শরীফের নেতৃত্বে শপথ নিলাম আমরা: আমি, হাসান, শামসুর রাহমান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ ছফা, মুনতাসীর মামুন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং অন্যরা। শপথ নিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের নামে।
মার্চ থেকে ডিসেম্বর
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি একটা ডায়েরি রেখেছি। সেই ডায়েরি অবলম্বন করে আমি একটা বই লিখেছি:জার্নাল ৭১। সেই জার্নাল থেকে বিশেষ বিশেষ অংশ তুলে আমি এই প্রবন্ধটা রচনা করেছি। আমি ডিসেম্বর থেকে পিছনে গিয়েছি, মার্চের দিকে। সে সময়ে আমরা একটা আন্ডার গ্রাউন্ড পত্রিকা বের করেছি। প্রথমে নাম ছিল স্বাধীনতা, পরে বদলে নাম দেয়া হয় প্রতিরোধ। ১১ ডিসেম্বর প্রতিরোধের সম্পাদকীয় এবং প্রতিরোধ পত্রিকার সম্পাদকীয় থেকে তুলে দিচ্ছি। ঢাকা শহর মুক্ত হতে চলেছে। বহু মৃত্যু ইস্পাতদৃঢ় প্রতিরোধ, রক্ত উজ্জ্বল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিজয়ী জনতা আজ ঢাকা শহর ঘিরে ধরেছে। ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের শক্ত ঘাঁটি, তাঁবেদারদের ডেরা, দালালদের বাসস্থান ঢাকা আজ আতঙ্কে শিহরিত, সেই সঙ্গে মুক্তির আনন্দে উদ্বেল, কারণ ঢাকা বিপ্লবের জননী, বিদ্রোহের পতাকা: কারণ চিরকালই বিদ্রোহীর সম্মানে সমুন্নত। এই সম্মান চিরকাল অটুট থাক, চিরকাল নিষ্কলঙ্ক থাক, কোনদিনও যেন ঢাকা শহর তার মাথা না নোয়ায়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর দৃপ্ত কুচকাওয়াজ ঢাকা শহরের চারপাশে; তারা এগিয়ে আসছে ডেমরা থেকে, টঙ্গী থেকে, সাভার থেকে, জিঞ্জিরা থেকে, তাদের সঙ্গে আসছে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের বিপ্লব। এই বিপ্লব কোন দলের নয়, সকল বাঙালির, এই বিপ্লবের অধিকার কোন দলের নয়, সকল বাঙালির, বাঙালি জনসাধারণ তাদের রক্ত দিয়ে, প্রতিরোধ দিয়ে, মৃত্যু দিয়ে বিপ্লবের সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে, সেই ভিত্তি হচ্ছে সমাজতন্ত্র এবং স্বাধীনতারও সামাজিক ভিত্তি হচ্ছে সমাজতন্ত্র। বাংলাদেশ বিপ্লবের লক্ষ্য সমাজতন্ত্র এবং বাঙালি জনসাধারণের স্বাধীনতার উদ্দেশ্য সমাজতন্ত্র, ঢাকা শহরের আসন্ন মুক্তির পূর্বক্ষণে এই সত্য আজ অনুভব করতে হবে। সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক ভিত্তিতে আছে সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদবিরোধী চেতনা, সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আছে সর্বপ্রকার শোষণবিরোধী চেতনা, সমাজতন্ত্রের মতাদর্শগত ভিত্তিতে আছে মনুষ্যত্বের চেতনা, বাংলাদেশ বিপ্লবের পশ্চাৎপট এ সবই।
তারও আগে
গিয়াসকে ধরে নিয়ে গেছে। তিনদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। সকালে নিয়ে যায় রমনা থানায়, বিকালে পৌঁছে দেয়। যন্ত্রণাজীর্ণ আমি। তিনদিন তিনরাত অপমানে ব্যর্থতায় ক্রোধে অস্থির আমি, আমার সহকর্মী আমার বন্ধু জিজ্ঞাসাবাদের নরক সহ্য করছে, আর আমরা কিছু করতে পারছি না, চোখে লেলিহান আগুন, হৃদয়ে ঘৃণার কোলাহল, হৃদয়ে যন্ত্রণা, এইভাবেই তিনদিন তিনরাত, এভাবেই দৈনন্দিন প্রতিরোধ স্নান মুখ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments