রক্তচিহ্ন
একটিবার দৌড় দিতে পারতাম।
এই আফশোসটুকু বারবার নাজেমের মনে আঘাত করতে লাগল।
কিন্তু তা আর এ জন্মে সম্ভব নয়। ডান হাত এবং বাম উরুর দিকে তাকিয়ে নাজেম সিদ্ধান্ত আর একবার মৌরসী করে নিলে। নিজে ঘাড় দুলিয়ে সমর্থন জানাতে অস্ফুট উচচারণের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্ধকারে গুলি কী ভাবে তার উরুর উপর লাগল সে বুঝতে পারেনি। তবে কি সাবেক অভ্যেস অনুযায়ী সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল গুলি চালানোর সময়? “রাইফেল নিয়ে বুকে হামাগুড়ি সহযোগে সব সময় এগোনো বা পেছানো উচিত, যদি শত্রুর এলাকায় এসে পড়ো বা অপারেশান শুরু হয়ে যায়, কখনও দাঁড়াবে না বা হঠাৎ উঠে দৌড়ানোর চেষ্টা করবে না।” ক্যাপ্টেনের কথাগুলো সাঁইসাই নাজেমের কানে তরল সীসার মত ঢুকতে থাকে। কিন্তু আর কোন চারা নেই। হাত-পা—দুই জখম। দৌড়ানো আর সম্ভব নয়। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে মাত্র তিন হপ্তার ট্রেনীং। তা-ই কি অমন ভুল হয়ে গেল? অথবা প্রথম পাঞ্জাবী সৈন্য ফায়ারিং রেঞ্জে এসে পড়ায় তার হুঁশ ছিল না। যেহেতু প্রতিহিংসার তাগিদ পেছনে সেই কবে থেকে অঙ্কুশরূপে খাড়া আছে। প্ল্যাটুন কম্যাণ্ডার অর্ডার দিয়েছিল কখন? নাজেম আজ তা-ও ভাবতে পারলে না।
‘এ্যাম্বুশ’ করতে বেরিয়েছিল তারা আটজন। খান-সেনাদের গতিবিধি ক’দিন থেকেই তারা লক্ষ্য করেছে। আজ জালে ঠিক পড়ে গিয়েছিল দুশমন। তবু এমন হঠাৎ দুর্বিপাক কী করে তাদের ঘিরে ধরল, নাজেম আর ভাবতে পারে না। আর ভেবে লাভ নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই ঠিক করতে হবে। সেদিকে কোন ভুল হয়নি। হাতের অস্ত্র খসে গিয়েছিল। বাম হাতে রাইফেলটা তুলে নিয়ে সে যথাসম্ভব কেবল হাতের কনুই আর এক পায়ের সাহায্যে, কখনও স্রেফ গড়াগড়ি দিয়ে নিজেকে বিপদমুক্ত করার চেষ্টা পেয়েছে। একসময় একটা ঝোপ দেখে রাইফেলটা গুঁজে দিয়েছিল। যদি সুসময় আসে, আবার বের করে নেয়া যাবে অথবা বন্ধুদের হদিস দিয়ে যেতে ভুল হবে না তার। মৃত্যুর কথা একবার চকিতে তার মনের উপর দিয়ে দৌড়ে গিয়েছিল বৈকি! কিন্তু সহজে দমে যায়নি সে। তার দলের সঙ্গীরা কোথায়? তারা কী যুদ্ধের ময়দানে শহীদ অথবা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সহজে কোথাও ওৎ পেতে সরে গেছে?
ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছিল নাজেমের। চাষীর সন্তান সে, মেহনতের পরোয়া রাখে না ৷ ছেলেবেলা থেকে খুঁটে খেতে শিখতে হয়। ধকল সওয়া যেন জন্মগত অভ্যেস। আর কেউ হোলে এতদূর আসতে পারত না অমন জখম শরীর নিয়ে। কালো কুচকুচে! নানা ঝড়-ঝাপ্টা সয়েও যৌবনের হাওয়ায় কি তরতরে চেহারা। এখন কাল্সিটে দাগ পড়ে গেছে মুখে।
তখনও রক্ত ঝরছিল ক্ষতস্থান থেকে। তবে পূর্বের মত ফিক ধরে নয় এবার ফোঁটায় ফোঁটায়। কিন্তু রক্ত পড়ার কামাই নেই। প্রথমে নিজেই চেপে ধরেছিল সে বাম হাত দিয়ে জায়গাটা। ওদিকে পায়ে আর এক উৎস। তখনই আবার সেই জায়গায় খবরদারি। একবার হাত, একবার পা। রক্তের তোড় কমিয়ে দিয়েছিল নাজেম, কিন্তু একদম বন্ধ করতে পারেনি। এক রকমের অবসন্নতা ঘিরে ধরছিল। কিন্তু মনের বল হারায়নি নাজেম। ঘষ্টে—ঘষ্টে গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছিল সে।
ফিকে জোছনায় চারিদিক আব্ছা। এমনই মৌকা খুঁজেছিল তারা। শত্রুর গতিবিধি দেখতে ভুল হবে না। কোন ভুল হয়নি। তবু হঠাৎ ওলটপালট হয়ে গেল। হয়ত রাজাকাররা গোয়েন্দাগিরি করেছে। অথবা আর কিছু।
রক্ত ঝরছে ফোঁটায় ফোঁটায়। মাঝে মাঝে ঝিলিক মেরে ওঠে। তখন আরো পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই একসময় নাজেমের মনে হয়, এইভাবে আর বেশীদূরে এগোনো যাবে না। লড়ায়ের নেশায় কোন্ দিকে এগিয়ে গিয়েছিল সে, তখন জানার বাইরে। জায়গাটা অচেনা ঠেকতে লাগল। তবু সিন্ধান্ত নিতে হয়। খান সেনারা তখনও এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলার স্তব্ধ গ্রামের পাঁজর ছেদ করে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments