সাপ রাজপুত্র
এক রাজা ছিলেন, তাঁহার নাম ছিল শূরসেন। রাজার পুত্র না থাকায় তাঁহার মনে বড়ই দুঃখ ছিল। সেই দুঃখ দূর করার জন্য তিনি অনেক দান-ধ্যান, অনেক যাগযজ্ঞ করিলেন। তাহার ফলে শেষে তাঁহার একটি পুত্র হইল বটে, কিন্তু সে সাধারণ লোকের ছেলেপিলের মতন নহে। সে একটি ভীষণ সর্প। যদিও মানুষের মতন কথা কয়।
রাজা মনের দুঃখে বলিলেন, ‘হায় হায়। এই সর্প লইয়া আমি কী করিব? ইহার চেয়ে যে পুত্র না হওয়া আমার অনেক ভাল ছিল।’
কিন্তু সাপ সে কথা ভাবিলই না, সে রাজাকে বলিল, ‘বাবা, আমার চূড়াকরণ উপনয়ন করাইলে না? আমার হাতে-খড়ি দিলে না? তাহা হইলে যে আমি মুখ থাকিয়া যাইব!’
রাজা আর কী করেন? তিনি ব্রাহ্মণ ডাকিয়া সব করাইলেন। সেই সাপ তখন দেখিতে দেখিতে সকল শাস্ত্র শেষ করিয়া মস্ত বড় পণ্ডিত হইয়া উঠিল। তারপর একদিন সে রাজাকে বলিল, ‘বাবা, আমার বিবাহ দিলে না? তাহা হইলে যে লোকে আমাকে ছেলেমানুষ ভাবিবে, আমার কথা গ্রাহ্য করিবে না। তোমারও বংশ লোপ পাইয়া যাইবে, তাহার দরুন শেষে তোমাকে ঘরকে যাইতে আর হইবে।’
রাজার মাথায় আকাশ ভাঙিয়া পড়িল। তিনি বলিলেন, ‘বাছা, তুমি যদি মানুষ হইতে তবে তো কোন মুশকিল ছিল না, কিন্তু তুমি যে সাপ, তোমাকে দেখিলে পালোয়ানেরাও ছুটিয়া পালায়। তোমাকে কে তাহার মেয়ে দিতে চাহিবে বল?’
সাপ বলিল, ‘নাই বা চাহিল। রাজাদের তো জোর করিয়া মেয়ে ধরিয়া আনিয়া বিবাহ হইতে পারে, তাই কেন কর না? আমার যদি বিবাহ না হয়, তবে আমি নিশ্চয় গঙ্গায় ডুবিয়া মরিব!’
এ কথায় রাজামহাশয় তো বড়ই সঙ্কটে পড়িলেন।
শেষে অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া তিনি তাঁহার অমাত্যদিগকে বলিলেন, ‘আমার পুত্র এখন বড় হইয়াছে, আর খুব উপযুক্তও বটে। তোমরা তাহার বিবাহের চেষ্টা দেখ।’
রাজার যে একটি ছেলে আছে, অমাত্যরা সকলেই তাহা জানে কিন্তু সেটা যে একটি সাপ, সে কথা তাহাদের কেহই জানে না। সে কথাটা রাজা মহাশয় গোপন রাখিয়াছিলেন। কাজেই রাজার কথা শুনিয়া তাহারা খুব উৎসাহের সহিত বলিল, ‘মহারাজ! আপনার যখন ছেলে তখন আর চেষ্টার বিশেষ দরকার কী? দেশ-বিদেশে আপনার নাম। আপনি যাহার নিকট চাহিবেন, সে-ই মেয়ে দিবে।’
রাজার একটি খুব পুরাতন বিশ্বাসী কর্মচারী ছিল, কিন্তু সে রাজার কথার ভাবে বুঝিয়া লইল যে ইহার মধ্যে কিছু চেষ্টার দরকার আছে। সে বলিল, ‘মহারাজ! আপনার অনুমতি হইলে আমি কন্যার চেষ্টায় যাইতে পারি। পূর্বদেশে বিজয় নামে এক রাজা আছেন, তাঁহার রাজ্য ধন লোকজন হাতি ঘোড়ার সীমা নাই। তাঁহার আটটি মহাবল পুত্র আর ভোগবতী নামে সাক্ষাৎ লক্ষ্মীর মত একটি কন্যা আছেন। সেই কন্যাই আপনার পুত্রবধূ হইবার উপযুক্ত।’
সেই কথায় রাজা ভারি খুশি হইয়া তখনই বিস্তর টাকাকড়ি ও লোকজন সঙ্গে দিয়া কর্মাচারীটিকে পূর্বদেশে রওনা করিয়া দিলেন। কর্মচারী রাজা বিজয়ের সভায় উপস্থিত হইয়া শূরসেনের পুত্রের জন্য তাঁহার কন্যা ভোগবতীকে প্রার্থনা করিল। সেই সাপকে সে জন্মেও চোখে দেখে নাই, জানে না যে সেটা সাপ। সে তাহাকে মানুষ ভাবিয়া আন্দাজে তাহার কত প্রশংসাই যে করিল, তাহা আর বলিবার নয়। তাহার একটি কথাও সত্য নহে। কিন্তু রাজা বিজয় তাহার আগাগোড়াই বিশ্বাস করিলেন, কাজেই বিবাহের কথা স্থির হইতে আর বিলম্ব হইল না। তারপর আর দু-একবার আসা-যাওয়া করিতেই বিজয় এ কথায়ও রাজী হইলেন যে, বর বিবাহ করিতে আসিবেন না, নিজের অস্ত্র পাঠাইয়া দিবেন, তাহার সঙ্গেই কন্যার বিবাহ হইবে। ক্ষত্রিয়দের মধ্যে এরূপ ঘটনা ঢের হইয়া থাকে, কাজেই তেমনি করিয়া কিছুদিনের মধ্যেই ভোগবতীর বিবাহ হইয়া গেল। কেহই জানিল না যে, সে বিবাহ একটা সাপের সঙ্গে হইয়াছে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments