হিটলার
লেখক:সৈয়দ মুজতবা আলী
হিটলারের শেষ দশ দিবস
ঠিক কুড়ি বৎসর আগে, ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল বেলা সাড়ে তিনটের অল্প পূর্বে হিটলার তার অ্যার-রেড় শেল্টার (বুঙ্কার মাটির গভীরে কন্ক্রিটের পঞ্চাশ ফুট ছাতের নিচের আশ্রয়স্থল কামানের বা প্লেন থেকে ফেলা গেলা বুঙ্কারের গর্ভ পর্যন্ত কিছুতেই পৌঁছতে পারে না) থেকে বেরিয়ে করিডোরে এলেন। সঙ্গে তার নবপরিণীতা বধূ এফা, প্রায় পনের বৎসরের বন্ধুত্বের (হিটলারের শেষ উইলে তিনি এই শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। বস্তুত নিতান্ত অন্তরঙ্গ কয়েকজন অনুচর ভিন্ন দেশের-দশের লোক জানত না যে হিটলার ও এফার মধ্যে সম্পর্ক ছিল স্বামী-স্ত্রীর) পর তিনি প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা পূর্বে এঁকে বিয়ে করেছেন। করিডরে গ্যোবে, বরমান প্রভৃতি প্রায় পনেরোজন তাঁর নিকটতম মন্ত্রী, সেক্রেটারি, সেনাপতি, স্টেনো, খাস অনুচর-চাকর সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হিটলার ও এফা নীরবে একে একে সকলের সঙ্গে করমর্দন করলেন। তার পর নিতান্ত যে কজনের প্রয়োজন তারা করিডরে রইলেন—বাদ-বাকিদের বিদায় দেওয়া হল। হিটলার ও এফা খাস কামরায় ঢুকলেন। অনুচররা বাইরে প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে একটিমাত্র পিস্তল ছোঁড়ার শব্দ শোনা গেল। অনুচররা আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন—তারা ভেবেছিলেন দুটো শব্দ হবে। সেটা যখন শোনা গেল না তখন তারা কামরার ভিতরে ঢুকলেন। সেখানে দেখতে পেলেন, তিনি সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আছেন, কিংবা পড়ে আছেনও বলা যেতে পারে। তার খুলি, মুখ এবং যে সোফাটিতে তিনি বসেছিলেন সব রক্তাক্ত। কেউ কেউ বলেন, তিনি মুখের ভিতরে পিস্তল পুরে আত্মহত্যা করেছেন, কেউ কেউ বলেন, কপালের ভিতর দিয়ে গুলি চালিয়ে। তার কাঁধে এফার মাথা হেলে পড়েছে। এফার কাছেও মাটিতে একটি ছোট পিস্তল। কিন্তু তিনি সেটা ব্যবহার করেননি। বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
তার পর কুড়িটি বৎসর কেটে গেলে পর ইয়োরোপের অনেক ভাষাতেই সেদিনের স্মরণে ও তার সপ্তাহখানেক পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার উপলক্ষে বহু প্রবন্ধ বেরিয়েছে।
আমার কাছে আসে প্রধানত জমনি, অস্ট্রিয়া ও সুইটজারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত জর্মন ভাষায় লিখিত সাপ্তাহিক। এগুলোর আসতে প্রায় দুমাস সময় লাগে। অ্যার-মেল হওয়ার ফলে বুকপোষ্ট, ছাপা-মাল যে কী জঘন্য শম্বুক গতিতে আসে সেকথা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।
হিটলারের মৃত্যুর পর তার সাঙ্গোপাঙ্গ অন্তর্ধান করেন। কেউ কেউ ধরা পড়েন রাশানদের হাতে। তার মধ্যে হিটলারের খাস চাকর (ভ্যালে) লিঙেও ছিলেন। কেউ কেউ লুকিয়ে থাকেন মার্কিন-ইংরেজ-ফরাসি অধিকৃত এলাকায়। এরাও ধরা পড়েন, প্রধানত মার্কিনদের দ্বারা। আর কারও কারও কোনও সন্ধানই পাওয়া যায়নি। যেমন বরমান ইত্যাদি কয়েকজন। এঁদের কে কে পালাবার সময় হত হন বা পালাতে সক্ষম হন জানা যায়নি।
গোড়ায়, অর্থাৎ হিটলারের মৃত্যুর কয়েকদিন পর রুশ জঙ্গিলাট জুকফ প্রচার করেন যে, হিটলার এফা ব্রাউনকে বিয়ে করার পর আত্মহত্যা করেন। এদিকে মস্কোতে বসে স্তালিন বলেন, হিটলার মরেননি, তিনি ডিকটেটর ফ্রাঙ্কোর আশ্রয়ে স্পেনে আছেন (স্তালিনের মতলব ছিল এই অছিলায় ইয়োরোপের শেষ ফ্যাশি ডিটেটর ফ্রাঙ্কোকে খতম করা)। এমনকি কোনও কোনও উচ্চস্থলে একথাও বলা হল যে, ইংরেজ(!) তাকে আশ্রয় দিয়েছে। ইংরেজকে তখন বাধ্য হয়ে পাকাপাকি তদন্ত করতে হয় যে হিটলার সত্যই বুঙ্কার থেকে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন কি না, কিংবা তিনি মারা গিয়েছেন কি না। এ কাজের ভার দেওয়া হয় ইতিহাসের অধ্যাপক, যুদ্ধকালীন গুপ্তচর বিভাগের উচ্চ কর্মচারী ট্রেভার রোপারকে।
তিনি তাদেরই সন্ধানে বেরুলেন যারা হিটলারের সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলেন। এদের কয়েকজন হিটলারের মৃত্যু, দাহ, অস্থি-সমাধি পুবানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করেন। কিন্তু বুঙ্কার ও তৎসংলগ্ন ভূমি তখন রাশানদের অধিকারে (পূর্ব বার্লিনে); তারা সেখানে অধ্যাপককে কোনও অনুসন্ধান করতে দিল না। হিটলারের যেসব সাঙ্গোপাঙ্গ রাশানদের হাতে ধরা পড়েন তারা যেসব জবানবন্দি দেন সেগুলোও অধ্যাপককে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments