অনুবৃত্তি
আজ সন্ধ্যায় উত্তর আকাশের মেঘগুলো নীলাভ হয়ে উঠেছে, আর তাই চেয়ে-চেয়ে দেখে আরশেদ হামেদের স্বচ্ছ চোখও যেন নীলাভ হয়ে উঠল। হাতে তার একটা বক্তজবা, গাঢ় লাল তার রং। পাশের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা যে-ক্ষীণাঙ্গী মেয়েটি বসে ছিল নীরবে, তার পানে চেয়ে সে বললে: ‘ওই যে নীল মেঘগুলো—স্নেহের মতো নরম কোমল নীলাভ মেঘগুলো, ওইগুলো দেখে হঠাৎ একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল, ভারি দুঃখময় সে ঘটনাটি। শুনবে?... বলছি, আগে এই ফুলটি নাও।’
মেয়েটির সরু-সরু আঙ্গুলগুলো কোমল আর দীর্ঘ, সে-আঙ্গুলগুলো দিয়ে সে হামেদের হাত হতে আস্তে ফুলটি নিলে, নিয়ে মাথা নিচু করে কেমন করে সেটা খোঁপায় গুঁজে দিলে। তার কালো চুলে লালফুলটি মানাল ভালো।
হঠাৎ সোজা হয়ে বসে পূর্ণদৃষ্টি মেলে হামেদ তাকালে মেয়েটির পানে। মুখটি তার সুন্দর নয় বটে, তবু দীর্ঘ ঘন পল্লবে ঘেরা চোখে, ঈষৎ পুরু ঠোটে, বাঁকা সরু ভ্রুতে, দীর্ঘ ক্ষীণদেহে আর স্নিগ্ধ উজ্জ্বল শ্যাম রঙে কেমন একটা আকর্ষণ। নাম তার বেগম—সংক্ষেপে।
মাথাটি আস্তে ঈষৎ হেলিয়ে ঠোটের প্রান্তে হেসে বেগম ফিরে চাইলে হামেদের পানে, মৃদুকণ্ঠে প্রশ্ন করল: ‘মানিয়েছে?’
‘মানিয়েছে, খুব মানিয়েছে।’
‘আহা, ভারি তো। ... আচ্ছা, এবার তোমার সেই ঘটনাটি বল, শুনি।’
মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা চিরন্তন অতৃপ্তি এবং ফেলে আসা স্মৃতির এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি। বাহ্যিক রূপ বা অভিনয়ে ভালোবাসার সেই পুরোনো আত্মিক টান এবং স্নিগ্ধতা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। মায়া আর বাস্তবতার এই যে সংঘাত, যেখানে মানুষ তার অতৃপ্ত হৃদয় নিয়ে এক মরীচিকার পেছনে ছুটে চলে এবং শেষ পর্যন্ত এক চরম শূন্যতা ও একাকীত্বের মুখোমুখি হয়।
দূরে দিগন্তরেখা ঘিরে আস্তে আস্তে আঁধার ছাপিয়ে উঠছে সমস্ত নীলিমা আর সমস্ত আকাশ, এবং কটা ম্লান তারা ফুটছে এখানে-সেখানে। বিচিত্র এই মহাকাশ, এই ধরণী, এই আধোআলো আধোছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ, ওই ক্ষীণ কম্পমান তারাগুলো, আর তাদের ঘিরে যে-শাশ্বত নিবিড় নিশ্ছিদ্র নীরবতা, সর্বশেষে এই চোখ, বাঁকা ভ্রূ আর লালফুল-গোঁজা চুলের খোঁপা। বেগম নীরব হয়ে রয়েছে গল্প শুনবে বলে, হামেদ নীরব হয়ে রয়েছে গল্প বলবে বলে, এবং এই নীরবতার মধ্যে আরশেদ হামেদের চোখ হঠাৎ ব্যথায় ভরে উঠল, যেন কোনো বিস্তৃত প্রস্থিত ঘটনা তার মনের দ্বারে ঢেউ জাগিয়ে তুলেছে, তারই আঘাতে তার চোখে ব্যথা উঠল ভরে। যে-কারুণ্য নীরবতার মধ্যে ক্রমে ক্রমে ফুটে উঠল তার চোখে, তা লক্ষ্য করে বেগম কিছুটা আহত হল; তার চোখের পানে চেয়ে নরম কণ্ঠে বললে: ‘থাকগে, ওসব বলে তোমার কাজ নেই। শোন, ওই আকাশের পানে তাকিয়ে নতুন-নতুন তারার জন্ম তুমি চেয়ে চেয়ে দেখ, আর আমি তোমাকে মৃদুকণ্ঠে একটা গান গেয়ে শোনাই। শোবে? শোও না আমার কোলে মাথা রেখে।
তারার পানে মুখ করে বেগমের কোলে মাথা রেখে শিশুর মতো হামেদ শুয়ে পড়ল: কোলটি উষ্ণ ও কোমল, যেন স্নেহভরা।
কয়েক মুহূর্ত পরে চোখ মুদে শান্তকণ্ঠে হামেদ প্রশ্ন করল: ‘বাসায় যাবার প্রয়োজন-তো তোমার তেমন নেই, না?’
‘না। কোনো সাংসারিক প্রয়োজন নেই, আর, উনি আসবেন শেষরাতের ট্রেনে, সে-তো তুমি জান। অবিশ্যি ন্যায়-অন্যায়ের কথা যদি তুমি তোল, তাহলে আমাকে এখুনি বাসায় ফিরে যেতে হয়, তবে এখানে এই নির্জনে সমাজ নেই তাই ন্যায়-অন্যায়ের শাণিত তলোয়ারও ঝলসাচ্ছে না এখানে।’
‘থাক। এবার তুমি গান ধর।’
‘ধরি।’ বেগম মাথা নিচু করে মিষ্টিভাবে হাসলে, তার চোখের পানে গভীরভাবে চেয়ে দেখলে, এলোমেলো শুষ্ক চুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে বললে: ‘তোমার চুলগুলো ভারি সুন্দর রেশমের মতো, হালকা আর নরম।’ থেমে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করলে: ‘আচ্ছা, একটা কথা।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments