মানুষ
দূরে সবুজ বনরেখা। সে বনরেখার পেছনে যে নীল পাহাড়গুলো দিগন্তরেখায় ঢেউ তুলে সারি-সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাহাড়িরা বলে সেখানে নাকি একটি স্বচ্ছ জলের গভীর হ্রদ আছে, যার চারিধারে প্রাচীর সৃষ্টি করে ভিড় করে রয়েছে দীর্ঘ ঘন সন্নিবদ্ধ পাইন-বৃক্ষ। ওই সবুজ বনরেখা পেরিয়ে সেই স্বচ্ছ জলের হ্রদের তীরে—জড়াজড়ি-হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন পাইনের বন ঘেঁষে আজ সকালে এক ঝাঁক নাম-না-জানা হলদে পাখি উড়ে গেল।
হলদে পাখির ঝাঁক উড়ে গেল, সকালের নম্র স্নিগ্ধ সোনালি রোদের ভেতর দিয়ে মনির তা-ই চেয়ে চেয়ে দেখেছে, অলস কান পেতে শুনেছে তাদের পাখার সম্মিলিত অস্ফুট ধ্বনি, আর চলতে-চলতে হোঁচট খেয়েছে। বনের অন্তরালে ওরা মিলিয়ে গেলে পাহাড়ের ওপরে ঝাউগাছটার তলে একটা তামাটে রঙের পাথরে সে বসলে। হলদে পাখির ঝাঁক গেল মিলিয়ে, ওধারে পাহাড় বেয়ে হলদে শাড়িপরা একটি মেয়ে উঠে আসছে ওপরে; পথটা আঁকাবাঁকা ও বন্ধুর, তাই সে চলছে ধীরে-ধীরে, মৃদু পায়ে।
ওপরের আকাশ কিছুটা সোনালি, কিছুটা ধূসর; দূরে কোথায় গভীর বনে ঘুঘু ডাকছে। পাহাড়ের নিচের নোংরা কাঠের বস্তিগুলো থেকে কুয়াশার মতো ধুয়ো উঠছে হাওয়াশূন্য আকাশ বেয়ে অতি ধীরে, ওই মেয়েটির চলার মতো। স্থানটি নিস্তব্ধ; সে-নিস্তব্ধতার মধ্যে মেয়েটির পায়ের মৃদু শব্দ এবার জেগে উঠল; ও কাছে এসে পড়েছে; একটা গাছে ও বাঁকের আড়ালে ঢেকে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত পরে অদূরের ওই গোলগাছটির কাছে সে বেরিয়ে এল, তারপর গাছের তলায় সরে এসে সেখানে উবু হয়ে বসল। গাছ হতে লাল ফুল ঝরে সে স্থানটা ভরে রয়েছে, তাই সে তার আঁচলে কুড়িয়ে নেবে।
মেয়েটি অন্ধ; তবু পথের সাথে তার পায়ের জানাশোনা, আর তার হাতের সাথে ফুলের পরিচয়। প্রতি সকালে সে অমনি করে আঁকাবাঁকা ও বন্ধুর পথ বেয়ে কোমল পায়ে পাহাড়ে উঠে আসে, গাছটার তলায় এমনি করে উবু হয়ে বসে আঁচল ভরে লাল ফুলগুলো কুড়িয়ে আবার নিচে নেবে যায়; নিচের নোংরা কাঠের বস্তিতে সে থাকে। এধারে তামাটে রঙের পাথরে বসে নীরবে তা-ই চেয়ে-চেয়ে মনির দেখে, তার ফুল কুড়োনোর ভঙ্গি, সরু কোমল হাতদুটি, স্থির নিস্তব্ধ ছোট মুখটি। মনিরের কথা সে হয়তো জানে না, তাই কোনোদিন ফুলকে গালে চেপে ধরে হঠাৎ হেসে ওঠে মধুর কণ্ঠে, নয়তো যে-শুকনো বাসি ফুলটি সে তুলে নিয়ে অবজ্ঞাভরে ছুড়ে দূরে ফেলে দিয়েছিল, সেটাকেই আবার স্নেহভরে হাতড়ে হাতড়ে কুড়িয়ে নেয়, সযতনে ঠোঁটের কাছে তুলে ধরে অস্ফুটকণ্ঠে কী সব কয়ে ওঠে, আর ঠোটের প্রান্তে হাসে একটু লাজরক্তিম হাসি।
মনির যখন অন্ধ মুলকীর এতদিনের বিশ্বাস ও স্বপ্নের রঙিন আকাশকে একনিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়ে নির্মমভাবে জানিয়ে দেয় যে নীল পাহাড়, স্বচ্ছ জলের হ্রদ বা হলদে পাখির ঝাঁক বলতে আসলে কিছুই নেই—সবই ছিল মিথ্যা; তখন মানুষের ভেতরের এক আদিম, হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ণ রূপ উন্মোচিত হয়। সত্য ও মিথ্যার এই নির্মম খেলায় মুলকীর চিরচেনা জগতটি যেভাবে অন্ধকারে হারিয়ে যায় এবং মনির যেভাবে নিজেকে কোনো এক অজানা আক্রোশে ক্ষতবিক্ষত এক 'মানুষ' হিসেবে জাহির করে।
ওপরে আকাশে এমন প্রসারিত অনুচ্চারিত নীরবতা আর দূরবিস্তৃত অতীতের শুভ্র বেদনাময় বিস্মৃতি যে মনিরের ঘুম- ক্লান্ত অবসন্ন মন হঠাৎ উদাস হয়ে উঠে ডানা মেলে ওই সোনালি আর ধূসর আকাশ বেয়ে নিঃশব্দ পাখাসঞ্চারে কোথায় যেন উড়ে চলল; বোধহয় হলদে পাখিদের পিছু পিছু সেই স্বচ্ছ জলের হ্রদের তীরে আর ঘন পাইনের বনে। মেয়েটির হলদে আঁচল লুটিয়ে পড়েছে সবুজ ঘাসে, লাল ফুলশয্যার ওপরে তার কোমল হাতদুটি চঞ্চল হয়ে উঠেছে, থেকে থেকে কাচের চুড়িতে মৃদু শব্দ উঠছে, আর তার দেহের একধারে, গালের আর চুলের প্রান্তে সূর্যের আলোর স্পর্শ লেগেছে। কী
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments