স্তন
আবু তালেব মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন সাহেব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মাঝে-মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ করাটা পারিবারিক ফরজ হিসেবেই দেখেন। যতদিন দুনিয়াদারির কাজে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন ততদিন সে-কর্তব্যটি ইচ্ছানুযায়ী পালন করতে পারেন নি। আজ তাঁর দায়িত্বের ভার অপেক্ষাকৃতভাবে লঘু হয়েছে বলে সে-কর্তব্য পালনে বাধাবিপত্তিও কমেছে।
সালাহ্উদ্দিন সাহেব যখন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যান তখন তার পূর্ব-আয়োজনটি রীতিমতো সফরের আয়োজনের মতোই মনে হয়। বিনা খবরে ঝট্ করে কারো বাড়িতে তিনি উপস্থিত হন না। দেখা করতে আসবেন বলে আগাম খবর পাঠান দিনকয়েক আগে। সময় প্রহর জানান, সঙ্গে-সঙ্গে এ-কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি চা-মিষ্টি কিছুই গ্রহণ করেন না, পান-দোক্তা তামাকের অভ্যাসও তাঁর নেই। তাছাড়া ডাক্তারের কড়া নির্দেশে পথ্য করেন বলে খানার দাওয়াতও গ্রহণ করেন না। বস্তুত এক গ্লাস পানি ছাড়া অন্য কিছু তাঁকে দেওয়া সম্ভব হয় না। তবু অসিদ্ধ পানিটা রোগ-ব্যাধির ভয়ে পান করেন না বলে তা-ও ক্বচিৎ স্পর্শ করেন।
তাঁর আত্মীয়স্বজনের চক্রটি কম বড় নয়। শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত সে-পরিবারের লোকসংখ্যা অগুনতি মনে হয়। তবু তাঁর বয়সের জন্যে এবং তাঁর সমৃদ্ধিসম্পন্ন আর্থিক অবস্থার জন্যে তিনি নিজেকে তাদের সকলেরই মুরব্বি বলে মনে করেন এবং পদ্ধতিক্রমে বছরের মধ্যে একবার দু-বার দেখা করে আসেন তাদের সঙ্গে।
তবে আত্মীয়স্বজনের চক্রটি বৃহৎ বলে তাঁকে একটা সীমারেখা টানতে হয়। যারা সে- চক্রের বহির্ভূত, নিয়মিতভাবে তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎটা করেন না। সবকিছুতেই কোথাও না কোথাও একটা সীমারেখা টানতেই হয়।
মানুষের তৈরি কৃত্রিম অনুশাসন আর রক্ষণশীলতার অন্ধকার যখন এক স্বাভাবিক সত্যকে আবৃত করতে চায়, তখনই অবদমিত মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়। সমাজের সেই নিথর চোখ আর অন্ধ সংস্কারের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের ভেতরের সত্য এবং বাইরের খোলসের এই যে দ্বন্দ্ব, তা-ই জীবনের এক পরম ও রূঢ় বাস্তবতাকে আমাদের সামনে উন্মোচন করে।
অতএব সেদিন অপরাহ্ণে বিনাখবরে সালাহ্উদ্দিন সাহেব যখন দেখা-সাক্ষাতের চক্রের বহির্ভূত দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় কাদেরের বাড়িতে উপস্থিত হন, তখন ঘটনাটি নেহাতই বিস্ময়কর মনে হয়। তিন দিন আগে কাদেরের ষষ্ঠ সন্তান জন্মগ্রহণ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে বলে তিনি-যে দুঃখ প্রকাশের নিমিত্ত এসেছেন তা মনে করা সম্ভব হয় না। সালাহ্উদ্দিন সাহেব নিজেই গভীর শোকগ্রস্ত। প্রায় একই সময় তিন দিন আগে প্রসবকালে তাঁর অতি আদরের ছোট মেয়ে খালেদার মৃত্যু ঘটে।
ক্ষুদ্র বৈঠকঘরে একমাত্র পিঠখাড়া-চেয়ারে আসন গ্রহণ করে সালাহ্উদ্দিন সাহেব লাঠির মাথায় তাঁর হাত দুটো জড়ো করেন। একটু দূরে শীতলপাটি বিছানো চৌকিতে কাদের মিঞা বসে। তার মুখে কৌতূহলের স্পর্শ। ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা বিরাজ করে।
অবশেষে উচ্চৈঃস্বরে গলা সাফ করে সালাহ্উদ্দিন সাহেব একনজর তাকান কাদেরের দিকে। তারপর অল্পক্ষণের জন্যে তাঁর চোখ ক্ষুদ্র ঘরের চতুর্দিকে ঘুরে বেড়ায়। স্বল্পবেতনের কেরানিমানুষ কাদেরের বাড়িতে সর্বত্র দারিদ্র্যের ছায়া। ঘরে আসবাব বলতে নড়বড়ে চেয়ারটি এবং চৌকিটি ছাড়া আর কিছু নেই। ছাতা-পড়া দেওয়ালে শোভার খাতিরে একটি ক্যালেন্ডার টাঙানো। তাতে নদীর বুকে রক্তিম সূর্যাস্তের ছবি। তাতে সেটি দু-বছরের পুরোনো। অপরাহ্ণের সূর্যের তির্যক আলোয় তাতে জমে থাকা ধুলা নজরে পড়ে। ওপাশে, ভেতরের দরজার কাছে মাটিতে বসে একটি বছর চারেকের মেয়ে বাটি থেকে মুড়ি খাওয়ায় রত। মুড়ি মুখে যতটা না যায় ততটা ছড়িয়ে পড়ে তার চারপাশে। গায়ে তার একটি অপরিচ্ছন্ন ফ্ৰক। মুখেও সর্বত্র ময়লার স্পর্শ।
সালাহউদ্দিন সাহেব যা দেখেন তাতে তিনি নারাজই হন। যে-প্রস্তাবটি নিয়ে তিনি কাদেরের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন সেটি উত্থাপন করা সমীচীন হবে কি না সে বিষয়ে ক্ষণকালের জন্যে তাঁর মনে একটা সন্দেহ জাগে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, সেটি উত্থাপন না করে উপায় নেই।
আবার গলা সাফ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments