মালেকা
মুখভাঙা কলের পাশ দিয়ে বেরিয়ে পিচ-ক্ষয়ে-আসা কঙ্করজর্জরিত পথটা ধরে মিনিট সাতেক হাঁটলেই ইস্কুল। ফিকে কমলা রঙের তাঁতের এবং সবুজ পাড়ের মিলের জীর্ণ শাড়ি দুটি অদল-বদল করে পরে মালেকা আজ ছ-মাস যাবৎ এ-পথে আসা-যাওয়া করছে। প্রথমে পথটা অতিক্রম করতে তার মনে হত অখণ্ড একটা ঘণ্টাই বুঝি কাবার হয়ে গেল। তখন তার পা-দুটো কেমন জড়িয়ে থাকত। খোলা আকাশের তলে উন্মুক্ত রাস্তায় নাবতেই লজ্জাজনিত যে-নিদারুণ জড়তায় সে অভিভূত হয়ে পড়ত, সে-জড়তার জন্যে প্রতি পদক্ষেপই অতিশয় দীর্ঘ মনে হত। ইস্কুলের চাকরিটা নেবার আগে সে কখনো এমন একাকী হাঁটে নাই।
অবশ্য অভ্যস্ত হতে সময় লাগে না, পথের সঙ্গে পরিচয় হতেও দেরি হয় না। তারপর সে বুঝতে পারে, দাইয়ের কথাই ঠিক। দাই বলে, পথটা কেবলমাত্র সাত মিনিটের। দাই অবশ্য ঘড়ি দেখে পথের দূরত্বটা কখনো নির্ণয় করে নাই। তবু তার আন্দাজটা কাঁটায় কাঁটায় নির্ভুল।
ঘড়ির কথায় হাসি আসে। বহু বছর আগে মালেকার স্বামী খন্দের দিনে একবার শখ করে সস্তায় একটা হাতঘড়ি কিনেছিল। দু-দিনের খেলার বা ফ্যাশনের শখ। সে-কথা জেনেই যেন হাতঘড়িটা ক-দিন চক্কর দিয়ে হঠাৎ একরাতে স্তব্ধ হয়ে যায়। এমনিতেই, আছাড় না খেয়ে, আঘাত না পেয়ে। তখন তার স্বামী আনকোরা নতুন জামাই, সরজমিনে হাওয়ার মানুষ। মরা ঘড়িটা ক-দিন তবু হাতে বেঁধে বেড়িয়ে শেষে সেটা তুলে রাখে ফুল-আঁকা টিনের বাক্সে। বলে, সারাবে। কিন্তু আর সারানো হয় না।
শখের কথা আলাদা। এদিকে গোটা একটা ইস্কুলই চলছে বিনা ঘড়িতে। ঘড়ি-যে একেবারে নাই, তা নয়। প্রধান শিক্ষয়িত্রীর ঘরে পশ্চিম দেওয়ালে সেকেলে আমলের মত ঘড়ি। তবে ধনী শিকারির বাড়ির দেয়ালে টাঙানো হা-করা বাঘের কল্লা যেন সেটি। ঘড়ির ধড়ে প্রাণ নাই; তার পেতলের গোল হৃৎপিণ্ডটা কয়েক মাস যাবৎ স্তব্ধ। ওপরওয়ালাকে সে-বিষয়ে জানানো কর্তব্য। প্রধান শিক্ষয়িত্রী জানাতেন এবং ঘড়ি মেরামতের জন্যে পয়সা দাবি করতেন, কিন্তু একটি কারণে তা করেন নাই। ঘড়ির বর্তমান অবস্থার জন্যে তিনি নিজেই কি দায়ী নন? ঘড়িটা কেমন গড়িমসি করতে শুরু করলে তিনি পথ থেকে তালা-চাবি মেরামত করার লোকটিকে যদি ডেকে না পাঠাতেন, তবে হয়তো ঘড়িটা এমন বেমক্কাভাবে হরতাল শুরু করত না। অবশ্য তাকে ডাকার পরামর্শটা দাই-ই দিয়েছিল। তার কথা শোনা বুদ্ধিমানের কাজ হয় নাই। ঘড়ির কলকব্জার ব্যাপারে সে কী বোঝে? তালা-চাবির লোকটাও বলতে পারত ঘড়ি-সারানো তার কাজ নয়। আসলে দুনিয়ায় ঠগবাজ জুয়াচোরের শেষ নাই, ভুল পরামর্শ দেবার লোকেরও অভাব নাই। শুধু তাই নয়। কানে কথা তুলবার জন্যেও সবাই সর্বক্ষণ তৈরি। চাকরির জন্যে প্রধান শিক্ষয়িত্রীর বড় মায়া। শখের মায়া নয়, নিতান্তই পেটের মায়া। কী হতে কী হয়ে যায়, সে ভয়ে তিনি সদা-সন্ত্রস্ত থাকেন। মাগি-ভাতা সমেত মাসে মাসে পঁচাশি টাকার মতো সামান্য যে মাইনেটা হাতে আসে, তা সংসার দরিয়ায় বিন্দুবৎ পানি। তবু তা হারাবার কথা ভাবলেই তাঁর বুকটা হিমশীতল হয়ে যায়।
একদিন বিভাগীয় দফতর থেকে একজন মহিলা ইস্কুল পরিদর্শন করতে আসবেন বলে চিঠি এলে তাঁর চিন্তার অবধি থাকে না। বস্তুত কয়েক রাত তাঁর ঘুমই হয় না। মাইনর ইস্কুলও ইস্কুল, এবং ইস্কুল চালানো সহজ ব্যাপার নয়। দায়িত্ব-তো তাঁরই। এমন দায়িত্ব পালনে এখানে-সেখানে দোষঘাট-গাফিলতি না হয়ে পারে না। নিজের দোষ নিজে কেউ দেখে না, কিন্তু অন্য কেউ চোখ খুলে দেখতে চাইলে অনেক কিছুই দেখতে পারে। অবশ্য বারবার চিন্তা করে দেখেও যখন তাঁর কাজে কোথাও দোষঘাট-গাফিলতি দেখতে পান না, তখন স্তব্ধ ঘড়িটাই তাঁর মানসিক যন্ত্রণার প্রধান সূত্র হয়ে দাঁড়ায়। ইস্কুল পরিদর্শনকারিণী সে-বিষয়ে প্রশ্ন করলে কী উত্তর দেবেন? ঘড়িটার বিষয়ে ভুলে থাকাও সম্ভব হয় না। চোখের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments