সাত বোন পারুল
বড় রাস্তা হতে যে-সরু নোংরা গলিটি নগণ্য ঘটনার মতো আলগোছে নীরবে ওধারে সরে পড়েছে, সে-গলি দিয়ে কয়েক পা এগুলেই এক বিচিত্র আবহাওয়ায় গিয়ে পৌঁছোনো যায়। এ যেন তুচ্ছ ঘটনার পুচ্ছ ধরে বিরাট পরিণতি স্ফীত হয়ে ওঠার মতো। বড় রাস্তা হতে মোনায়েম সে-গলিতেই মোড় নিল।
একটা ঝুনো বাসার দরজায় কড়া নাড়তে যে মেয়েটি এসে দরজা খুলে দিল, তাকে মোনায়েম প্রথমেই বলল: পথ ভুলে আসি নি, বিশ্বেস কর।
মেয়েটি হাসলে, বললে: তা না হয় করলাম, কিন্তু ওরা যা খেপেছে সে-কথা আর বলবার নয়। বিচারে কী সাব্যস্ত করেছে জানেন?
কী? সভয়ে মোনায়েম তাকাল ওর চোখের পানে।
আপনাকে এ-বাসায় আর কক্ষনো ঢুকতে দেয়া হবে না।
বল কী, সর্বনাশ!
তা বৈকি!
কিন্তু তুমিতো ছিলে, কিছু এধার-ওধার করতে পারলে না? মা
নে? আমিই জজিয়তি করেছি, কী ভেবেছেন আপনি?
বাস্রে!
বাস্রে নয়, ভিতরে চলুন।
১৯৪২ সালের কলকাতার পটভূমিতে মধ্যবিত্ত জীবনের একঝাঁক তরুণীর প্রাণোচ্ছলতা, মোনায়েম ও সাত বোনের মিষ্টি খুনসুটি, চপলতা ও কৃত্রিম আদালত বসানোর চমৎকার হাস্যরসাত্মক উপাখ্যান।
ঘরে ঢুকেছে কী অমনি এ দরজা দিয়ে সে-দরজা দিয়ে একটা-দুটো করে ক্রমে ক্রমে আরো ছটা মেয়ে এসে হাজির হল। মোনায়েমকে দেখেই সবগুলো হুল্লোড় লাগিয়ে দিলে, কেউ-বা চেঁচাতে লাগল, কেউ-বা হাসতে থাকল, কেউ তীক্ষ্ণ গলায় কথা কইতে শুরু করল। রুনু নামের মেয়েটি এবার শুধাল: শুনেছেন?
শুনেছি। কিন্তু অপরাধ?
অপরাধ এই যে—এই ঝুনু, রায়টাই না-হয় পড়ে শোনা ৷
সেরেছে, আদালত বুঝি বসল আবার
কিন্তু ঝুনু এগিয়ে এসে হাত নেড়ে বললে: না, ভয় নেই, আদালত আর বসবে না। কিন্তু রায়েতে যা- শাস্তিবিধান করা হয়েছে তা-ই পালন করা হবে।
শুকনো গলায় মোনায়েম বললে: কিন্তু ঢুকে পড়েছি যে—। আমার কিছু দোষ নেই, ওই তোমাদের জজসাহেবাই তো—
যে-মেয়েটি দরজা খুলেছিল তার নাম মুনু। সে তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললে: আমি রায় বদলে ফেলেছি। শাস্তি হবে অন্য ধরনের, বলছি।
আদালত? পাইক-পেয়াদা উজির-নাজির ডাকব? ওপাশ থেকে টুনু গলা-উঁচিয়ে উৎসাহিত হয়ে প্রশ্ন করল। সে-কথায় কান না দিয়ে মুখ উন্নত করে চোখ নত করে গম্ভীরভাবে মুনু বললে: শাস্তিবিধান এই যে—–ছুলু কোথায়, মানে দারোগা?
সভয়ে চোখ বড় করে মোনায়েম বললে: বাসরে্! আবার দারোগা কেন?
সে-কথার কেউ উত্তর দিলে না। ছুলু দুমদাম পা ফেলে এগিয়ে এল, তাকে কাছে টেনে মুনু যেন তার কানে-কানে কী বলে দিলে, আর সে সরে এসে মোনায়েমের কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বের করলে সিগ্রেটের টিনটা, করে ওপাশে লুলুর হাতে চালান করে দিলে। গলা শক্ত করে গম্ভীর সুরে মুনু বললে: শাস্তি এই যে, আপনাকে আমাদের বাসায় সারাদিন আটক করে রাখা হবে, এবং একটা সিগ্রেটও আপনাকে খেতে দেওয়া হবে না।
সেরেছ! কিন্তু অপরাধটা কি একবার শুনতে পাব না?
ও! মুনু যেন আকাশ হতে পড়ল, অবাক হয়ে বললে: বা রে, বলা হয় নি বুঝি? তবে শুনুন, মন দিয়ে কিন্তু? অপরাধ হল এই যে, কোলন ড্যাশ, ব্রাকেটে এক নম্বর, আপনি একমাস যাবৎ আমাদের বাড়িমুখো হন নি, দাঁড়ি। ব্রাকেটে দ্বিতীয় নম্বর, আমাদের নামে কবিতা লিখেছেন ‘দুনিয়া’ সাপ্তাহিকে, দাঁড়ি।
শুধু কবিতা কেন, ভাবছি বিরাটকায় একটা উপন্যাস লিখব। বলেই তাড়াতাড়ি মোনায়েম জিভ কাটল, তক্ষুনি হেসে ভালোমানুষের মতো বললে: ও, আসল কথাই তোমাদের বলা হয় নি!
কী কথা?
মানে, এ মাসটা আমি কলকাতায় ছিলাম না, গিয়েছিলাম—
শুনেই টুনু এবার চেঁচিয়ে হেসে উঠল, অবাক হয়ে বললে: ওমা, কী মিথ্যে কথা! কেন, লুলু আপনাকে সেদিন দেখে নি ট্রাম থেকে বগলে বিরাট প্যাকেট চেপে ছেঁড়া-চটি-সামলে ফুটপাত ঘেঁষে চলছিলেন হনহন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments