বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকট ও অক্টোবর বিপ্লবের প্রতি পুনঃদৃষ্টিপাত
ভূমিকা
১৯৯০-এর দশকে কিছুটা আগে-পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে বিস্ময়কর দ্রুততার সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়। এসব দেশে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটে এবং নিকৃষ্ট পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটে। কেউ কেউ যাকে “ মাফিয়া পুঁজিবাদ” হিসাবে অভিহিত করেছেন। এই দিক থেকে অনেক প্রগতিশীলই একে প্রতি বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারো কারো মতে অবশ্য এই পরিবর্তন ছিল “মন্দ” থেকে অধিক “মন্দে” পরিবর্তন। তারা আমলাতান্ত্রিক সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে ভালো বলতে নারাজ। পরিবর্তনের প্রকৃতি যাই হোক না কেন প্রগতিশীল আদর্শিক জগতে এর একটি বিরাট বিরূপ প্রভাব পড়ে। দেশে দেশে বিপ্লবী আন্দোলন প্রবল আদর্শিক আক্রমণের সম্মুখীন হয়। ঘোষণা করা হয় যে, ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে এবং সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে এবং পৃথিবীতে মুক্ত বাজার অর্থনীতি বা পুঁজিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছে। পৃথিবীতে ভবিষ্যতেও এই শ্রেষ্ঠত্ব অব্যাহত থাকবে বলে রিগ্যান-থ্যাচার এর অনুসারী সাপ্লাই সাইড অর্থনীতির প্রবক্তারা দাবি করতে থাকেন। অপেক্ষাকৃত সংস্কারবাদী নরমপন্থীরা দাবি করেন যে বিপ্লব বা কমিউনিস্ট পার্টি দিয়ে আর সমাজের পরিবর্তন হবে না। সামাজিক সংস্কার, সোশ্যাল ডেমোক্রেসি, বাজার সমাজতন্ত্র এগুলিরই একমাত্র কিছুটা ভবিষ্যৎ থাকলেও থাকতে পারে। অনেকেই দাবি করেন পৃথিবী এখন শান্তিপূর্ণভাবে পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতরেই ধীরে ধীরে সামনে অগ্রসর হতে থাকবে। কিন্তু নরমপন্থীদের আত্মসমর্পন, নয়া উদার নীতিবাদের এই আত্ম সন্তুষ্টি ও বিজয়োল্লাস দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ২০ বছর যেতে না যেতেই শুরু হয়ে গিয়েছে এক তীব্রতম অর্থনৈতিক সঙ্কট। ১৯৩০ এর পর এত বড় বৈশ্বিক সঙ্কট পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় আর হয় নি। এই সঙ্কটের ব্যাপকতার একটি ধারণা পাওয়া যায় নিম্নোক্ত একটি তালিকা থেকে। ১নং তালিকার তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে:
১। চলমান আর্থিক সঙ্কটের কারণে বিশ্বের পুঁজিবাদী কোম্পানি সমূহের মোট ক্ষতির পরিমাণ ১৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ২। এটি সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের এক বছরের আভ্যন্তরীণ জাতীয় উৎপাদনের (১৩.৮ ট্রিলিয়ন) চেয়ে বেশি।
৩। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সর্বাদিক ক্ষতিগ্রস্থ বাড়ি মর্টগেজ বাবদ মোট অর্থের পরিমাণ হচ্ছে ১০.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি জি.ডি.পি এই সঙ্কটের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।
৪। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসক শ্রেণিকে তাদের বিপদগ্রস্ত কোম্পানিগুলির জন্য “উদ্ধার কর্মসূচি” বা “বেইল আউট” কর্মসূচি বাবদ খরচ করতে হবে ৯.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ যে, “জাতীয়করণ” ও “ভর্তুকির” ব্যাপারে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়া উদারনীতিবাদী তাত্ত্বিকেরা এতদিন তীব্রভাবে সোচ্চার ছিলেন সেই “ভর্তুকির” ও “জাতীয়করণের” নীতি তারাই এখন উল্টো গ্রহণ করেছেন। তফাৎ শুধু এইটুকু যে এবার “জাতীয়করণ” করা হচ্ছে “ক্ষতি”-কে এবং “ভর্তুকি” দেয়া হচ্ছে সঙ্কট সৃষ্টির জন্য দায়ী অপরাধী ধনী পুঁজিপতিদেরকে।
৫। খোদ আমেরিকায় এই ধনী কোম্পানিদেরকে প্রদেয় “বেইল আউটের” মোট পরিমাণটি লজ্জাকরভাবে বিশাল। দুনিয়ার দরিদ্র দেশগুলিতে ১৯৭০-এর পর থেকে প্রদত্ত তথাকথিত “বৈদেশিক সাহায্যের” মোট পরিমাণের তুলনায়ও এটি চার-পাঁচ গুণ বেশি।
৬। আরেকটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তান যুদ্ধে মিলিতভাবে যে মোট অর্থ ব্যয় করেছে (প্রায় ০.৭ ট্রিলিয়ন ডলার) তার তুলনায় এবারের অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য তাকে ব্যয় করতে হবে প্রায় ১৪ গুণ বেশি অর্থ (৯.৭ ট্রিলিয়ন ডলার)।
আর তথ্য না বাড়িয়েই বলা যায় যে, বিশ্ব পুঁজিবাদ যথার্থই এক তীব্র সঙ্কটে পতিত হয়েছে। আর এ থেকে উদ্ধারের জন্য প্রত্যাখাত সমাজতন্ত্রের কাছ থেকেই “রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ”, “ভর্তুকি”, “জাতীয়করণ” ইত্যাদি, “পলিসি ইনস্ট্রমেন্ট” ধার করতে হচ্ছে—তফাৎটুকু এবার শুধু এগুলোর ক্ষেত্রে “কে কাকে দিচ্ছেন” তাতে অর্থাৎ শ্রেণি সুবিধা ও শ্রেণি চরিত্রের তফাৎ। সমাজতন্ত্রে এসব সুবিধা যেখানে ভোগ করতেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, এখানে সেটা ভোগ করবেন সংখ্যালঘিষ্ঠ পুঁজিপতি-এলিটবৃন্দ। অন্যদিকে একই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments