রণেশ দাশগুপ্ত : একজন মানবতাবাদী মানুষ
রণেশ দাশগুপ্ত—আমাদের রণেশদা'র সঙ্গে আমার পরিচয় হয় যশোর জেলে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আমাকে পাঠানো হলো যশোর জেলে ১৯৫০ সালের অগাস্ট মাসে। সেখানে গিয়ে রাজবন্দি হিসেবে পেলাম বরিশালের নুটু ব্যানার্জি, আর ঢাকার রণেশ দাশগুপ্ত ও দেবপ্রসাদ মুখার্জিকে। ১২ নং ওয়ার্ডের দোতলায় বেশ একটা বড়সড় প্রশস্ত কক্ষে আমাদের রাজবন্দিদের রাখা হতো। সাজাপ্রাপ্ত রাজবন্দিরা ছিলেন পৃথক ওয়ার্ডে। রণেশদার নাম আগে শুনেছি। সম্ভবত ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার সদরঘাটের গীর্জাসংলগ্ন এক মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভায় অধ্যাপক অজিত গুহ ও রণেশদা ছিলেন বক্তা। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বটি শ্রমের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক।
তারপর ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে রণেশদা গ্রেফতার হন। আন্দোলন শেষে সবাইকে মুক্তি দেয়া হলেও তাঁকে ছাড়তে রাজি ছিল না সরকার। কারণ, তিনি একজন সুপরিচিত কমিউনিস্ট কর্মী। ছাত্ররা বেঁকে বসল রণেশদাকে মুক্তি দিতে হবে। গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জেলের ভেতরে এদের নেতৃত্ব দিয়েছেন ভাষা আন্দোলনে গ্রেফতারকৃত সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দেয়ার দাবিতে। ফলে রণেশদাকে কারা কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর ১৯৪৯ সালে রণেশদা আবার গ্রেফতার হন। সেই সুবাদে যশোর জেলে তাঁর দেখা পাই। আমাদের রাজবন্দি ওয়ার্ডে খুলনার একজন ডাকাতকেও রাখা হয়েছিল। সাধারণত রাজবন্দিদের সঙ্গে অন্য কয়েদিদের মেলামেশা না হয় এদিকে জেল কর্তৃপক্ষ কড়া নজর রাখেন। এক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ, মনে হয়েছিল যে, আমাদের ওপর নজর রাখার দায়িত্ব ছিল তার ওপর। তাকে কেন নিরাপত্তা আইনে রাখা হয়েছিল সেটা ছিল রহস্যপূর্ণ। তার নাম শেখ রেহানউদ্দিন। খুলনায় বাড়ি। না, তাকে নিয়ে আমাদের কোন অসুবিধায় পড়তে হয় নি। যাক সে কথা। যশোর জেলে গিয়ে দেখলাম প্রায় প্রতিদিন বিকেলে নুট ব্যানার্জি মোটা একটা খাতা নিয়ে বসেন। আর রণেশদা বক্তা। সেখানে আমিও শামিল হলাম শ্রোতা হিসেবে। দেব প্রসাদ মুখার্জিও ছিলেন। দেখলাম রণেশদা স্মৃতি থেকে বিভিন্ন দেশের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বলছেন, তিনি ইংরেজি সাহিত্য, মার্কিন সাহিত্য, জার্মান সাহিত্য, ফরাসি সাহিত্য-এর প্রতিটি বিষয় ধরে এমন চমৎকার করে গুছিয়ে বলতেন মনে হতো যেন এক একটি দেশের সাহিত্যের ইতিহাসের কোন বই পড়ছি। বিভিন্ন উপন্যাস ও ছোটগল্পের চরিত্র বিশ্লেষণ করে রণেশদা বলে চলেছেন, ব্যাখ্যা করছেন বিশ্বের খ্যাতনামা নাট্যকারদের নাটক উপন্যাসের বিষয়বস্তু নায়ক-নায়িকার চরিত্র আমাদের নিকট স্পষ্ট হতো। তিনি শুধু বিশ্লেষণ করেই ক্ষান্ত থাকতেন না।
বিভিন্ন দেশের সাহিত্যের সঙ্গে তার মাটি ও মানুষের সম্পর্ক, তার মানবতাবাদী উপাদানের পেছনে কোন শক্তি বা শ্রেণী সক্রিয় কিংবা নিয়ামকের ভূমিকা নেয়; এবং বিভিন্ন চিন্তাধারা ও সামাজিক অবস্থান থেকে তার অন্তর্গত ধ্যান-ধারণা কিভাবে আধুনিক ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাহিত্য সর্বজনীন চরিত্র অর্জন করে, তাও তিনি দেখিয়ে দিতেন। এই উপমহাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি যখন ঝানভ-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে রণদিভে লাইনের মতো অতিবাম পন্থা গ্রহণ করে, এবং রবীন্দ্র বর্জনের 'গুপ্ত যুগ' প্রতিষ্ঠার উদ্যম চলে সেখানে রণেশদা একমাত্র যিনি এই রবীন্দ্র বিরোধিতার রাজনৈতিক দর্শন গ্রহণ করেন নি। ফলে পার্টির ভেতর তিনি যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছেন। রণদিভে যুগের রণনীতি, রণকৌশল গ্রহণ করেও রণেশদা শেষ পর্যন্ত সাহিত্য বিচারে উন্মার্গগামিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
যশোর জেলে এই সাহিত্য আসরে আমরা দুজন শ্রোতা, নুটু ব্যানার্জি বিস্তারিত নোট নিতেন, বক্তা রণেশদা। কখনো আমার ইবসেনের কোন নাটক পড়া হয় নি। তিনি ইবসেন সম্পর্কে বুঝিয়ে বলতেন যে, কিভাবে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে নাট্যকার তুলে ধরেছেন, সমাজে অবহেলিত নারী সমাজের মুক্তির যে বাণী ইবসেনের নাটকে জ্বলে উঠেছে তা সমসাময়িক ইউরোপে কী ঝড় তুলেছিল। রণেশদার এই বিশ্লেষণ পড়েই জেলের বাইরে এসে যতগুলো ইবসেনের নাটক যোগাড় করতে পেরেছি, পড়েছি। আমি যশোর জেলে দু-বছরের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments