বার্তাবহ
সে ভেসে চলেছিল।
পঞ্চভূত এখনও তার সহায় হয়নি। শুধু বাতাস আর জলের সাথে সে এগিয়ে চলেছে। স্রোতের টান মৃদু। বাতাসের আমেজ ঝিরিঝিরি ৷ বাইরের জগতে কোন তাড়াহুড়৷ নেই। আর যে ভাসছে, তার কাছে গতি এখন অর্থহীন। শ্লথ বা দ্রুত—কী আসে যায়। মহাকাল সামনে পড়ে আছে। বেসবুর হওয়ার প্রয়োজন অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। বুকে যখন বাতাস থাকে, তখন বাইরের বাতাসকে জমা খরচের হিসেবে আনা যায় ৷ আজ সব হিসেব-নিকেশ আগামী ইতিহাসের কাছে তুলে দিয়ে সে পরম নিশ্চিন্ত।
সে ভেসে চলেছে।
সটান চিৎশায়িত। মুখ আকাশের দিকে। চোখ নেই। দাঁড় কাক দু'তিন দিন ধরে তা খুবলে খুবলে খেয়ে শেষ করেছে। কারণ, চোখের মালিকের কাছে চোখ থাকা বা না থাক৷ একই কথা। শুধু চোখ কেন? অনেক কিছুই নেই। গায়ের জামা খানিকটা গলার কাছে লেগে আছে। ডোরাদার কোন ছিট কাপড়। আস্ত আছে শুধু জুতা জোড়া দুই পায়ে ৷ লেস টাইট করে বাঁধা। কাঁচা চামড়া সামনে থাকতে দাঁড় কাক ট্যান চামড়ায় কোন্ দুঃখে মুখ দেবে? বা তেমন মেহনতে পোষাবে না। কাকের মত চতুর প্রাণী তা আরো ভালো করে জানে ৷
হাত দুটো বুকের উপর আড়াআড়ি আছে কিন্তু শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা। বাঁধন এখনও অটুট আছে। অবিশ্য হাতের সব জায়গায় মাংস নেই ৷ হয়ত নদীর মাছ অথবা কাক বা চিল বা শকুন ভাগ নিয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ আগেই একটা শকুন বসেছিল তার কপালের উপর। কয়েকটা নৌকা আসতে দেখে আবার উড়ে গেছে। সে নিস্তব্ধ দেখে আর কোন প্রাণী ভয় পায়না। তাই এত কাছে এসে জুলুম করে। কিন্তু জুলুম কেন? অত্যাচারের সঙ্গে কষ্ট, যন্ত্রণা বেদনা আর্তনাদ কতো কী একজোট। এখানে তার কোন লেশ তুমি খুঁজে পাবেনা। সুতরাং কেউ জুলুম করছে বলা অন্যায়। প্রাণীরা আর কতটুকু জুলুমই বা করতে পারে? এখানে বাঘ, সিংহ বা হায়েনা কিছু নেই। নিরীহ কাক অথবা শকুন। কালে ভদ্রে নির্বাক কোন মাছ হয়ত এক খাবলা মাংসের লোভে নিকটে আসে।
ছোট উপনদী। খুব জোর তিন শ’ গজ চওড়া।
দুই তীরের মধ্যে নৈকট্য আছে। মাঝে মাঝে ঘন বসত পাড়ে। কোথাও কোথাও শুধু ফাঁকা মাঠ। কিন্তু কোন গ্রাম দু’মাইল দূর নয় নদীর কূল থেকে।
সে ভেসে চলেছিল।
দুই দামাল বালক দুপুরে নিজেদের গৃহপালিত প্রাণী গরু বা ছাগলের খোঁজে বেরিয়েছিল। হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল তার ভাসমান শায়িত মূর্তি। একজন মাত্র অপরের চেয়ে বছর দুই বয়সে বড়। সেই সুবাদে মিয়া ভাই।
—দেখছ মিয়া ভাই।
—আরে কোন শরীফ লোক। মিলিটারী হালারা মারছে।
—মারে নাই। দড়ি-বান্ধা দ্যাহো না?
—গুলি করছে না?
—না। বাইন্দা পানির মদ্দে ছাইড়া দিছে।
—আহা!
—আহ!
দুই জনে গালে হতে দিয়ে বেবুঝ নির্বাকের মত নদীর ধারে বসে পড়েছিল। তাদের চোখ আর ভাসমান বস্তুর উপর নিবদ্ধ নেই। নদীর ওপারে বিরাট মাঠের ওধারে আর এক নদী আছে যদিও দেখা যায় না—বাদামের সারি থেকে প্রমাণ। তাদের চোখ এমনই কিছুর উপর অথবা দৃষ্টি শূন্যে ভাসছিল।
হঠাৎ বয়স্ক মিয়া ভাই গ্রামের দিকে দৌড় মারলে। ছোট জন কিছু বুঝতে না পেরে বসে রইল। অন্য সময় হলে সে হঠাৎ অন্তর্ধানের হদিস বের করতো অন্তত কিছু একটা জিজ্ঞেস ছাড়া যেতে দিত না। আজ অনুজ নির্বাক নদীর ধারে দার্শনিকের মত চুপচাপ আকাশ পাতাল ভাবতে লাগল। যেন কোন কিছুই সে চোখে দেখছেনা। তা স্পষ্ট জানা গেল, যখন একবার দৃষ্টি মেলে সে মৃত জনের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটিতে আরম্ভ করলে। শবানুগমনের পয়লা সারির প্রথম জন।
সে এই ভাবে নিশিগ্রস্তের মত হেটে যেত। হঠাৎ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments