ক্ষমাবতী
মেয়েটা আর হাঁটতে পারছিল না।
অনেক আগেই বাপ তার ক্লান্তি লক্ষ্য করেছে। আগে তবু সে পায়ে পায়ে চলার তাল ঠিক রাখছিল। নিজে যেমন জোর দেয়, কন্যাও তেমন গতি দ্রুত করে। কিন্তু তার পক্ষেও সামাল দেওয়া অত সহজ নয়। পয়ষট্টি বছর বয়সে গায়ে আর কতো তাগত থাকে? যা ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। তবু যে সে মাটির উপর পা ফেলে ফেলে এগোতে পারছিল, তা কম আশ্চর্যের ব্যাপার নয়।
চিন্তার সময় আর কোন এক সময়ে পাওয়া যাবে। এখন শুধু পথের দূরত্ব শেষ করে আনাই একমাত্র উদ্দেশ্য। কারণ, আবার কখন শত্রু ধাওয়া করবে, কে জানে? এই শত্রু আশপাশের কোন ডাকাত নয়। ডাকাতেরও ভয় থাকে। এই দস্যুদের কোন ভয়-ডর নেই, দিনে-রাতে যখন খুশী আসতে এবং যা খুশী করতে পারে। কেউ বাধা দেবে না। কেউ এগিয়ে আসবে না এতটুকু সাহায্য করতে। এই শত্রু বাংলাদেশের কেউ নয়। তার জন্ম বাংলায় নয়। নিজের ভাষায় কাকুতি-মিনতি করবে বা দোহাই দেবে মনুষ্যত্বের—আল্লার—রসুলের? কোন যোগাযোগ নেই এমন প্রতিপক্ষের সঙ্গে। কোথায় কোন এলাকা আছে পশ্চিম পাকিস্তান—সেখান থেকেই নাকি এরা আগত।
তমিজ মিয়া তেইশ বছর ধরে সে কথা শুনে এসেছিল। আরো শুনে এসেছিল তারও আগে বড় বড় মিটিং মারফৎ: ওরা আমাদের ভাই, এক মজ্হাব ( ধর্ম ) এক কেতাব, একই রসুলের উম্মৎ—সব প্রাণে প্রাণ, এক কওম। একটা একটা বিশ্বাসের শিকড় তমিজ মিয়ার বুকে জায়গা নিয়েছিল। নিরক্ষর মানুষ। তাই নিজে আর বেশী তলিয়ে দেখতে রাজী ছিল না। লেখাপড়া জানা মানুষেরা যা ব’লে সে মেনে নিয়েছিল। তার বেশী কিছু দরকারও ত নেই। অত মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? মেহনৎ করে দিন গুজ্রান হলেই খোদার কাছে শোকর। দুনিয়ার কাছে দাৰী-দাওয়াও বেশী নেই। দু’মুঠো ভাত বছরে দু'টো লুংগী একজোড়া গাম্ছা। শীতের মৌসুমে কোন রকমে গা-ঢাকা একটা কিছু। চাদর না হয় মোটা একটা জামা। চাহিদা একদম আঙুলে গণা যায়। আর কি বা চাওয়া যায় আল্লার কাছ থেকে? সংসারে বউ থাকলে হয়ত চাহিদা বাড়ে। সেদিকে তমিজ মিয়ার খালি হাত-পা। দশ বছর আগে বউ মরে গিয়েছিল। মেয়েটার বয়স তখন মোটে পাঁচ। আর নিকার সাধ জাগেনি তার। আর মেয়েটা হয়েছে এমন যে, যেন দুনিয়ার সব কিছু পাওয়া হয়ে গেছে তার। ছোট মেয়েরা কতো বায়না ধরে বাপের কাছে। আজব মেয়ে তামিনা—তহ্মিনা—তার অমন জিদই নেই। আর কোন সন্তান হয়নি তমিজ মিয়ার। স্ত্রীকে বাঁজা ধরে নিয়েছিল। হঠাৎ আল্লার কী শান বুড়ো বয়সে উত্তর পঞ্চাশে এমন দৌলতে ঘর ভরে দিলে। কী খুশী হয়েছিল তমিনার মা। আল্লা সাধ পুরো করেছেন। একটা মেয়ে। জামাই আসবে ঘরে। কতো আহলাদ। কিন্তু আল্লাহ্ হঠাৎ তাকে তুলে নিয়ে গেল। হ্যাঁ, হঠাৎ। বার দুই দাস্ত, কয়েকবার বমি। সব শেষ। পরে বাপ হোলো মা। প্রতিবেশীদের কিছু সাহায্য নিতে হোতো। তা-ও খুব অল্প। পাঁচ বছরের মেয়ে যেন মায়ের বয়স নিয়ে জন্মেছিল। একদম পঞ্চাশ বছরের গৃহিণীর মত বোধ। ধীরে ধীরে সব গুছিয়ে নিলে। ন’বছর বয়সে বাপের জন্যে রান্না পর্যন্ত পাকা গৃহিণীর মত সেরে রাখত। আর কী মেহনতী গতর। বিয়ে অনেকে আগেই দিতে পারত। অমন লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু তমিজ মিয়ার আশা এইখানে কিছুটা আকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিল। বিঘে তিনেক জমি আর হালের গরুর মালিক সে। অল্প-স্বল্প জমিয়ে কোন ঘর-জামাই আনতে পারলে সব দিক রক্ষা হয়। মেয়ে ঘরে রইল আর একজন জোট-বল মানুষও পাওয়া গেল। এইসব ভেবেচিন্তে একটু দেরী।। নচেৎ বারো পার হতে দিত না সে। পনর এমন বেশী বয়স নয়। তাছাড়া, মেয়ে ছাড়া বেঁচে থাকার চিন্তাও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments