বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন অঙ্গাঙ্গী জড়িত। দেখা গেছে রাজনৈতিক কিছু মুনাফা আদায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আবার শেষোক্ত আলোড়ন উপরি উপরি যাই হোক, তার দীর্ঘ মেয়াদী উদ্দেশ্য কিন্তু রাজনৈতিক। বাংলাদেশে এখনকার প্রবণতার হেতু সন্ধানের জন্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটভূমি-সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।
অনেকে তো পাকিস্তানের জন্মলগ্ন নিজের নাড়িতেই অনুভব করেছেন।
তাঁদের জন্যে বেশী কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু অনেকের জ্ঞান কেবল ইতিহাস মারফৎ। তাই অতীতের কবর আবার নতুন করে খুঁড়ে দেখতে হয়।
পাকিস্তান গঠিত হয় দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর। মুসলমানরা এক জাতি, যেহেতু তাদের ধর্ম এক। মোদ্দা কথা এইখানে এসে দাঁড়ায়। ধর্মকেই জাতীয়তা গঠনের একমাত্র উপাদান-রূপে তখন মুসলিম লীগ প্রচার করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের হালে এই তত্ত্ব পানি না পেলেও রাজনৈতিক চাপে তা সহজে টিকে গেল না শুধু, দেশই দ্বি-খণ্ডিত করে ছাড়ল। এই সাফল্যের কারণ সম্পর্কে নানা বিশ্লেষণ আছে। জাতীয়তাবাদী নেতাদের উপর অনেকে দোষ চাপিয়েছে। কারো মতে মুসলিম লীগ দায়ী। কেউ কেউ তৃতীয় পক্ষ ইংরেজের কারসাজি বলে প্রচার করেছেন। অতিসরলীকরণের প্রবণতায় এমন সব কথা আজো শুনতে হয়। কিন্তু যা তত্ত্ব হিসেবে টেকে না তা রাজনৈতিক সত্য হিসেবে কি করে জানান দিল? মনস্তাত্ত্বিকেরা যুক্তিবিচারহীন আবেগ-জগতের দিকে ইশারা দেন। দশ কোটি মুসলমান নচেৎ কী ভাবে একটা অযৌক্তিক সমাধানের দিকে ছুটে গেল। দুই দশক পরে ঐ গড্ডলিকা-প্রবাহের পরিণাম অতি স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্মই নচেৎ হোত না। কিন্তু এক যুগে দশ কোটি মানুষ মোহগ্রস্ত হোয়েছিল। নিজের মঙ্গলামঙ্গল দেখে নি। সংখ্যালঘিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানের পাকিস্তানের জন্য কোন মাথাব্যথা থাকা উচিত ছিল না। কিন্তু তারাও সেদিন চোখ বুজে নিয়েছিল, যুক্তির ধার ধারে নি। আধুনিক শিল্পসমাজের রাজনৈতিক আন্দোলন: পাকিস্তান। কিন্তু তার ভাবধারা মধ্যযুগীয় ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত। অবিশ্যি এখানে ইসলাম ধর্ম বলতে বোঝায় লীগ নেতারা যা বুঝতেন। কারণ, এই ইসলামের স্বরূপ ব্যাখ্যা-সম্পর্কে তাঁদের কোন চেষ্টা ছিল না। এই স্বরূপ যত ঘোলাটে থাকে, ততই মঙ্গল। রাজনৈতিক মুনাফা-অনুযায়ী তার অদলবদল চলত। জিন্নাহ্ সাহেব যিনি ভুলেও সহজে পশ্চিম মুখে আছাড় খেয়ে পড়তেন না, তিনি হোলেন মুসলমানদের ইমাম। আর বিশ্বে কোরাণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার বা তফসীর-কারক মৌলানা আজাদ হোলেন ‘শো-বয়’। এমন বহু স্ববিরোধের ছবি তখন পাওয়া যায়। একদিকে ভাবধারা মধ্যযুগীয়, কিন্তু উদ্দেশ্য জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ—রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সে চিন্তা আবার অত্যাধুনিক। অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলনের কোন যুক্তিযুক্ত বনিয়াদ ছিল না। কিন্তু তবু একটা নতুন রাষ্ট্র গড়ে উঠল। এই স্ববিরোধ তখন স্পষ্ট হয় নি। কিন্তু যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র চালু হোল এবং কালে কালে তার সমস্যাগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, তখন আভ্যন্তরীণ বিরোধের কেলাসন ঘটতে লাগল। বেশ দ্রুতই বলতে হয়। আর স্ববিরোধ কি একটা? কতো রকমের। দেশ ভাগের পূর্বে বিভাগই সকল জাতির উন্নতি। কিন্তু দেশবিভাগের পর তারাই পাকিস্তানকে এক ইউনিট বানিয়ে ফেললে এবং ঘোষণা করলে, অমন অখণ্ডতার মধ্যেই জাতীয় উন্নতির পথ নিহিত। দু’মুখো সাপের বিষ নাকি নামে না। কথাটা প্রবাদ হোলেও এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত সত্যি। ১৯৬৫-৭১ এই ছ’ বছরে যে-ঘূর্ণীপাকে পাকিস্তান উপনীত তা ইতিহাসের তুষারঝটিকা বলা চলে। বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন পূর্বোক্ত স্ববিরোধ ধ্বংসের শঙ্খনাদ।
এই সঙ্গে বাঙালী মুসলমানের মানস পটভূমির সঙ্গে কিছু পরিচয় দরকার। পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্বের চরিত্রও কিছু আলোচনার দাবী রাখে, পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানে যার রূপ স্বতন্ত্র আলাদা। বর্তমান স্ববিরোধের প্রকাশ একদিক থেকে অতীত-বীজের পরিণতি মাত্র। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ-নেতৃত্ব মধ্যবিত্তশ্রেণী হতে উদ্ভূত। এরা সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারায় আপ্লুত থাকলেও বাংলাদেশে পাশ্চাত্য চিন্তার অভিঘাতও ঢের বেশী। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্ব পুরোমাত্রায় সামন্ততান্ত্রিক। সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান কি উত্তর সীমান্ত প্রদেশে তার একই চেহারা। সকলেই বিরাট
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments