জন্ম যদি তব বঙ্গে
দাঁড়াও, পথিকবর।
এই দেশে ত তোমার জন্ম। একবার দাঁড়াও। একটু দাঁড়াও। তুমি ত সীমার নও। কারবালার যুদ্ধের পর ইমাম হোসেনের কাটা শির নিয়ে দামেস্ক নগরীর দিকে ধাইছ। হঠাৎ এসে পড়েছো। কেউ ত এদিকে আসে না। যখন এসে পড়েছ, একটু দাঁড়াও।
আমি জানি, কেন এমন বে-পথে তুমি এসেছ। বন-জঙ্গলের পথে কেউ হাঁটে না। কিন্তু বাঙলাদেশের মোহিনী মায়া সকলকে টেনে নিয়ে যায়। আর তোমার জন্ম ত এই বঙ্গে। তুমি বে-পথু হবে, তা আর আশ্চর্য কী?
কতো দরিদ্র আমাদের গ্রাম। কী আছে মানুষের সম্পদ? একটা খড়ো ঘর বা কুটির। এক চিলতে উঠান। হয়ত কয়েকটা কলাগাছ বা বাঁশগাছ বাস্তুর ধারে। দুনিয়ার দৌলত নেই। সেই অভাব মিটিয়ে যায় গাছপালা, বনবাদড়। আর মাঠের বিস্তার ত আকাশকে ডাক দিতে দিতে দৌড়ায়। বুকে নদীর ছলাৎছল কোথাও বেঁধে নেয়, যেখানে আকাশমুখী নৌকার লগী কখনও সচল কখনও অচল, যদি নৌকার সঙ্গে বাঁধা থাকে। অবসর পেলে তাই সকলেই দুষ্টু ছেলে সেজে বসে। হেঁটে হেঁটে দেখে, তখন পথ-বিপথ কেউ মানে না। গ্রামের বনবাদাড় জঙ্গল কেবল শেয়ালের প্রিয়। না, শেয়ালও ত বাঙলাদেশের শোভা, রাত্রির প্রহর ডেকে যায়। আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে ঢেউ তুলে যায়, যখন দুষ্টুমি করে কোন গেরস্থর মুর্গীহাঁসের উপর লোভ দেখায় |
তাই তুমি যখন পথ ছেড়ে মাঠের এই জংলা আবহাওয়ার দিকে পা বাড়িয়েছিলে, তখনই আমি বুঝেছি, জন্ম তোমার বঙ্গে।
সেই সুবাদেই তোমাকে ডাক দিয়েছি।
একটু দাঁড়াও।
আমিও এই দেশে জন্মেছিলাম। আমার আর কোন ঠিকুজী জেনে লাভ নেই কারো। তার দরকার নেই।
আমি বাঙলাদেশের অধিবাসী। এই দেমাক-ই একজনের পরিচয়ের জন্য কী যথেষ্ট নয়? বাড়ী কই, পেশা কী? এসব ত আমার কাছে অবান্তর মনে হয় ৷ আবার কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে বসে, হিন্দু না মুসলমান? তাও আমার কাছে অবান্তর ৷ এই দেশে জন্মেছি, এ-ই কী আসল পরিচয় নয়?
একটু দাঁড়াও
তুমি থমকে গিয়েছ। আমার ডাকে? না, বাঙলার সবুজ মায়ার হাতছানি তোমার চোখে যে আলতো স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে, তার আবেশে?
জানো, গাছপালার মর্মর সকলের কানে পশে না। এমন হতভাগ্য বহু আছে এই দেশে। এই মাটির সুগন্ধ অনেকের নাকে যায় না, এমন হতভাগ্য বহু আছে এই দেশে। তাদের আমি বড় করুণার চোখে দেখতাম। পরে ঘৃণা করতে শিখলাম, তুমুল ঘৃণা ৷ কেন জানো? ওরা আর মানুষ থাকে না ৷ তখন হিংস্র জন্তুর মত দপাদাপি করে বেড়ায় ৷ জন্তুর মতই ওরা বোঝে না মা-বোনের ইজ্জতের মূল্য। গ্রামকে গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায় আগুনে, হাজার হাজার মানুষের লাশ নদীপথে খড়কুটোর মত ভাসে, অসহায় অনাথ শিশুরা রাস্তায় রাস্তায় কাঁদে, শীতের দাপটে কুঁকড়ে কুকুরে মত আদমের সন্তান-সন্ততি হাত-পা সব বুকে গুটিয়ে পড়ে থাকে গাছতলায়, ক্ষেতে-খামারে।এমন শত শত দৃশ্য? না হাজার হাজার। না। লাখ লাখ দেশবাসীর বুক ফেটে আহাজারী মহরমের মাতম বেরোয় ৷ কিন্তু ঐসব মানুষ—না জন্তু, ওদের মনে কোন আঁচড় পড়ে না। কারণ, তার চোখে কোন দিন বাঙলার জলা-জঙল, গাছপালার মায়া ধরা পড়েনি।
আমি জানি, তুমি কেন থমকে দাঁড়িয়েছ। বাতাসের মর্মরের সঙ্গে যে আমার ডাক বাঁধা। তুমি শুনতে পেয়েছ বৈকি। তাই ত ডাক দিয়েছি: দাঁড়াও পথিকবর।
একশ' বছর আগে সাগরদাড়ীর, না, বাঙলাদেশের বিদ্রোহী বজ্রকণ্ঠ কবি রেখে গিয়েছিলেন, নিজের কবর থেকে দেশবাসীদের অভিমানক্ষুব্ধ স্বরে আহ্বানের অভিলাষ। আমি ত তারই মত দেমাকী, কারণ আমি বাঙলাদেশের অধিবাসী। তাই ত তোমাকে ডাক দিয়েছি। দাঁড়াও, পথিকবর। আমিও কবরে শুয়ে আছি। না, কবর নয়। বরং বলব মাটির তলায় শুয়ে আছি। কারণ, কবর বললে অনেক কিছু বোঝায়। তা-ই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments