স্বাধীন প্যালেস্টাইন-ভূমি: প্রেক্ষিত ও সাম্প্রতিক
চলতি বছরের গোড়ার দিকে এক মার্কিন সাংবাদিক বৈরুতে এসেছিলেন যুদ্ধসংঘাতপূর্ণ এলাকার বালকদের জীবন নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রণয়নের উদ্দেশে। সেখানে তিনি ছয় মাসের শিশু ‘প্যালেস্টাইনের’ দেখা পান—১৯৮১ সালের জুলাইতে বৈরুতের আবাসিক অঞ্চলে ইজরায়েলের নৃশংস বিমান হামলার সময় শিশুটির জন্ম। বোমা-বিধ্বস্ত এলাকার রাজপথে পড়েছিলো রক্তাক্ত মায়ের মৃতদেহ। চারপাশের ধ্বংসের মাঝে বিস্ময়করভাবে বেঁচে যাওয়া সদ্য-প্রসূত শিশুটির কান্না সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মৃতা মায়ের কোনো পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং নবজাতককে বুকে তুলে নিল যে উদ্বাস্তু পরিবার তারা শিশুটির নাম রেখেছিলেন ‘প্যালেস্টাইন’। দুঃখের অসীম পাথারে বহমান জীবনের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে যে শিশু, নিশ্চিতভাবেই সে মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে আপন জাতির বেদনাময় কিন্তু, বলীয়ান জীবনাদর্শের। এই নাম-তিলক তাকেই সাজে।
বড় কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে প্যালেস্টাইনী বিপ্লব। অনধিক ৪০ লাখ মানুষের এই জাতি সংখ্যাগত হিসেবে ক্ষুদ্র জাতিই বটে। যে জায়নবাদীরা ইজরায়েল রাষ্ট্রের পত্তন ঘটেয়েছিলো তারা তাই সম্পূর্ণতই অস্বীকার করেছিলো প্যালেস্টাইনীদের অস্তিত্ব, ইজরায়েল তাদের কাছে ছিল মনুষ্যবিহীন এক ভূখণ্ড এবং ইহুদীরা হচ্ছে ভূখণ্ডবিহীন এক জাতি। তাই এই মাটিতে তাদের পরম অধিকার, আছে বটে বিক্ষিপ্ত বেদুইনের মতো মুষ্টিমেয় প্যালেস্টাইনী। ১৯৬৭ সালে জন-সংঘর্ষের অল্পকাল পরে একটি বৃটিশ পার্লামেন্ট দলের জেরুজালেম সফরকালে ইজরায়েলী সংসদ নেসেট-এর বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির প্রধান তাদের বলেছিলেন যে, “প্যালেস্টাইনীরা মানুষ নয়, মনুষ্যপদবাচ্য নয়, তারা হলো আরব।” দু’বছর পরসানডে টাইমসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে গোল্ডা মেয়ার বলেছিলেন, “প্যালেস্টাইনী বলে কিছু ছিলো না। ...এমন নয় যে, প্যালেস্টাইনে প্যালেস্টাইনী মানুষ বসবাস করতো যারা নিজেদের প্যালেস্টাইনী মনে করতো এবং আমরা এসে তাদের বিতাড়িত করলাম ও তাদের দেশ কেড়ে নিলাম। তাদের কোনো অস্তিত্ত্বই ছিল না।” মেনাহেম বেগিন কখনোই উচ্চারণ করেন না প্যালেস্টাইনী, তার ভাষায় এরা সন্ত্রাসবাদী। এবং ১৯৮১ সালের আগস্টে রোনাল্ড রেগান বলেছিলেন, “প্যালেস্টাইনী সমস্যা বলে কিছু নেই। এটা হচ্ছে আরব উদ্বাস্তু সমস্যা অন্য আরব দেশে যাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে।” এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৯৬৭ সালের ২৪২নং প্রস্তাবে পরম ভ্রান্তির পরিচয় দিয়ে প্যালেস্টাইনী সমস্যাকে উদ্বাস্তু সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো যদিও এরপর ভ্রান্তি মোচনের পথে জাতিসংঘ দূত এগিয়ে যায় এবং অগ্রসর হয় অনেক দূর।
সমস্যাকে অস্বীকার করলেই বিলপ্তি ঘটে না সমস্যার এবং আমেরিকা-ইজরায়েলের নেতৃত্বের সেটা ভালভাবেই জানা রয়েছে। তাই প্যালেস্টাইনী সমস্যার অস্তিত্ব অস্বীকার করার পাশাপাশি চলেছে শক্তি প্রয়োগে সমস্যা সমাধানের প্রয়াস—রাজনৈতিক ও সামরিক উভয়ভাবেই চলেছে তৎপরতা এবং সাম্প্রতিক লেবানন যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে, বর্বরতম গণহত্যা সংঘটিত করতেও তারা দ্বিধান্বিত নন।
তিনশত বছর আগে ইংরেজ কবি জন মিলটন বলেছিলেন, “সব যুদ্ধের সূচনা খুঁজে পাওয়া যাবে সংঘাতের প্রথম ঘটনায় নয় বরং তার প্রস্তুতি ও অভিমতসমূহে।” কথাটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংঘাত নয়, বরং সংঘাতপূর্ববর্তী ঘটনাবলী কিঞ্চিৎ তলিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং প্যালেস্টাইনী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার পথরেখা খুঁজে পেতেও অতিক্রান্ত যুগগুলো স্বচ্ছভাবে বোঝা দরকার।
ইহুদী আবাসভূমির পত্তন ও বিকাশ
১৮৯৭ সালে বাসলে অনুষ্ঠিত প্রথম জায়নবাদ সম্মেলনে থিওডোর হার্জল ঘোষণা করেছিলেন যে, “জায়নবাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের একটি জাতীয় আবাস প্রতিষ্ঠা”। জায়নের পতাকার নিচে সকল ইহুদীকে সমবেত হওয়ার এই আহবানের অর্থ খুব শিগগিরই পরিষ্কার হয়ে উঠলো—ইহুদী বর্জোয়ারা যোগাবে অর্থ বৃদ্ধিজীবীরা যোগাবে আন্দোলনের আত্মিক শক্তি এবং সাধারণ-মেহনতী মানষ দান করবে তাদের শ্রম। হার্জল পরিকল্পনা অনুসারে প্যালেস্টাইনে বসতি স্থাপন করবে প্রথম “সবচেয়ে বেপরোয়াগণ, তারপর গরিবরা, অভিন্ন স্বার্থে চাঁদা হিসেবে এরপর স্বচ্ছল ব্যক্তিরা এবং সবশেষে ধনীদল। দিতে হবে একটি স্বর্ণ মুদ্রা—শেকেল।” যারা মেনে নিয়েছিলেন বাসল কর্মসূচী এবং দান করেছিলেন শেকেল তাদেরকে গণ্য করা হতো জায়নবাদীরূপে।
হার্জল ভালভাবেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments