আলোক অন্বেষা

চোখের উপর একটু আলতো হাত বুলাতে পারলেও যেন এখন কিছুটা যন্ত্রণার উপশম হতো।

অসহ্য অস্থিরতা ভেতরে ভেতরে এত ঘুরপাক রত যে, সালামৎ আলী ঠিক হদিস করতে পারছিল না। এই মুহুর্তে যথা-প্রতিষেধ তার জন্যে কী আছে। হঠাৎ-ই মনে পড়ল অমন করস্পর্শের কথা, যদিও সচেতনভাবে কিছু নয়।

প্রতিবর্তী ক্রিয়া হিসেবে হাত তুলতে গিয়ে সালামৎ নিদারুণভাবে অনুভব করলে, তার যো নেই।

হাতকড়ার শাসন ধমকে সব ঠাণ্ডা করে দিল।

কিন্তু সালামৎ সহজে পেছপা হয় না। মাথা নিয়ে গেল সে নিজের হাতের চেটোর মধ্যে। সেখানে দুই ফেটি-বাঁধা চোখ ঘষতে লাগল।

হঠাৎ তার এমন নত মুখ পাঞ্জাবী প্রহরীর চোখ এড়ায় নি। সে ব্যাপারটা দেখেই চুপ করে যেতে পারত। কিন্তু তা দূরের কথা, বরং উল্টো গালাগাল ছুঁড়লে, ‘এই শালা, বাঙ্গালকা বাচ্চা!’

কিছুতেই দেখতে পাচ্ছে না সালামৎ আলী। কিন্তু কান তো খোলা। তার বুঝতে দেরী হয় না, শাস্ত্রীর চোখ তার দিকে ঠিকই আছে। কিন্তু মাথা খসে পড়ছে যে-মাথা করতালুর মধ্যে বন্দী, তবু কিছু সোয়াস্তি পাচ্ছিল।

সালামৎ আলি তখন হঠাৎ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। আটচল্লিশ ঘণ্টা কেটে গেছে, তার চোখ এমনি ফেটি-বাঁধা।

পৃথিবী কেমন দেখতে? নিজেকে সে জিজ্ঞেস করে বসে। তারপর জবাব নিজেই দিতে এগোয়। বহু অতীত তখন হুড়াহুড়ি ধাক্কা দিতে থাকে তার মনের ভাসমান সমতলে জায়গার জন্যে। এই গুঁতোগুতি অনেকক্ষণ চলে।

ওদিকে চোখের যন্ত্রণাও চেপে বসছে। তবু হাতড়ে-ফেরা দৃষ্টি যেটির মধ্যেই ছবি আঁকতে থাকে। অজস্র বুদ্বুদ্‌, অজস্র রঙের স্রোত কেবল অক্ষিপটের ভেতর দিয়ে হুহু ঢুকে যাচ্ছে গন্তব্যহীন যাত্রায়।

কিন্তু সে তো এক ঠিকানায় এসে পৌঁছেছে।

কোন্ জায়গায় তাকে মিলিটারিরা এখন আস্তানা দিয়েছে? তার একটা হদিস করা যেত। তবু কিছু শান্তি! ঢাকা শহরে তার জন্ম সেই একান্ন সনে। কুড়ি বছরে এই ছোট শহর জরীপে কিছু বাদ নেই তার। একটা জায়গার নাম পেলে সে যেন সব যন্ত্রণা ভুলে যেত। শান্তিনগর, মালিবাগ, শাঁখারিপট্টি, ইসলামপুর, রমনার কোন এলাকা? এ জায়গা ধানমণ্ডির নয়াবাদ অভিজাত-পল্লীর কাছাকাছি কোথাও হোতে পারে না। বন্দীশিবির আর কোথাও নিশ্চয়। শহরের মাঝখানে এত লোক ধরে রাখবে, অন্যান্য মানুষকে ভয় দেখাতে এমনও হোতে পারে। কিন্তু হাতড়ে কিছু হেঁটে যেতে পারলে সে বুঝতে পারত, তার আস্তানার হদিস কি? মেঝে পাকা। আর কিছু বোঝার উপায় নাই। কারণ, ঠায় বসে অথবা দাঁড়িয়ে থাকা। কড়া হুকুম। এদিক ওদিক করলে সাইকেলের চেন পেটা, করবে। দু’বার শাস্তির রোলার তার দেহের উপর দিয়ে ঘষড়ে ঘষড়ে কিছু কাপড়, কিছু রক্ত, কিছু ছাল নিয়ে গেছে।

আর তাগদ বেশী নেই।

আটচল্লিশ ঘণ্টা একটা দানা পড়েনি পেটে। তার জন্যে কোন আফসোস নেই। একবার দেখতে পেত সে পৃথিবী কেমন, তা হোলেই ক্ষুৎপিপাসা সব মিটে যেত।

বাইরের জগৎ শব্দ দিয়ে চেনা যায়। এখানে বড় সীমাবদ্ধ। জীপের যাতায়াত, স্টার্ট ধ্বনি আর ভারী বুটের আওয়াজ, কালেভদ্রে কথাবার্তা। এখানে যা মনুষ্যকণ্ঠ উচ্চারিত হয়, তা শুধু হুকুম। আর কিছু না।

নিকটে আশেপাশে লোক থাকলে, তাদের চলাফেরা কথাবার্তা না হোক নিঃশ্বাসের বাতাস অন্তত কিছ জানান দিয়ে যেত। সেদিক পর্যন্ত শূন্য। শান্ত্রীর সঙ্গে একটা যোগাযোগ হোতে পারত আহারের ব্যবস্থা থাকলে তাও নেই।

অবিশ্যি ক্ষুধা যা প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সালামৎ আলি একবার অনুভব করেছিল। তারপর তার দেহ-যন্ত্রের আর কোন চাহিদা নেই। কেবল চোখ বেয়াড়া জিদ্দী ছেলের মত বায়না নিয়ে মেতে আছে: আলো, এতটুকু আলো আলো দাও। অতি ঝাপসা। হিমপ্রত্যূষের কুয়াশালেপা ক্ষীণতম আলো যা চোখ তেড়ে ধরতে হয়, এমন আলো।

এই প্রার্থনার জবাবে কিন্তু অন্ধকার কেবল ধেয়ে আসে, ঘনীভূত হয়—শেষে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice