নরেন্দ্র দেব (১৮৮৮-১৯৭১)
নরেন্দ্র দেব গত ১৯শে এপ্রিল মারা গেছেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। সাহিত্য-জগতের সঙ্গে তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল, কিন্তু তাঁর যুগ শেষ হয়েছিল অনেকদিন আগে। যে-কোনো মৃত্যুই দুঃখের, বিশেষত এমন মানুষের, যাঁর কাছ থেকে আমরা নিত্য স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছি। বাঙলা সাহিত্যের দিক থেকেও ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ নরেন্দ্র দেবের মৃত্যু বাঙলা সাহিত্যে একটি যুগের অবসান। বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দুই দশকের সাহিত্যপত্রিকাগুলিতে নূতনত্ব এসেছিল বক্তব্যে ও প্রকাশরীতিতে—‘মানসী’, ‘যমুনা’, ‘ভারতী’ পত্রিকা নানা কারণেই আজকের দিনেও স্মরণীয়। নরেন্দ্র দেব সে-যুগের আধুনিক লেখক। বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস থেকে তাই তাঁর নাম বাদ পড়বে না। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, শরৎচন্দ্র স্নেহ করতেন; সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, যতীন্দ্র মোহন বাগচী প্রভৃতি ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এবং সৌভাগ্যক্রমে পরবর্তীযুগের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়নি, তিরিশের দশকের তরুণ লেখকেরাও ‘নরেনদা’কে শ্রদ্ধা করতেন। মানুষ হিসাবে তিনি ছিলেন উদার, স্নেহপরায়ণ, রসগ্রাহী। ফলে অন্যযুগের মানুষ হয়েও এ-যুগের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি।
যখন স্কুলে পড়ি তখন ‘পাঠশালা’ পত্রিকার মধ্য দিয়েই নরেন্দ্র দেবের নামের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। লেখা পাঠিয়েছি, ফেরৎ এসেছে, কদাচিৎ ছাপাও হয়েছে। তারপর স্কুলের শেষ ধাপে ‘ভালোবাসা’র সঙ্গে প্রথম পরিচয়। নরেন্দ্র দেবের বাড়ির নাম ‘ভালোবাসা’। আর অন্য পত্রিকায় লেখা পাঠানো নয়, এবার নিজেই পত্রিকা বার করা যাক। এবং পত্রিকার জন্য চাই নরেন্দ্র দেবের লেখা। লেখা পেলুম, সেই সঙ্গে পেলুম তরুণ সম্পাদকের অকিঞ্চিৎকর প্রয়াসের সোৎসাহ সমর্থন। তারপর অনেকবার গেছি। চিঠিও পেয়েছি নানা ব্যাপারে, পোস্টকার্ডে কোনাকুনি লেখা কবিতার মতো, সুন্দর হাতের লেখা। এইতো সেদিন, যতীন্দ্রমোহন বাগচীর জীবনী লেখার জন্য যখন তথ্য সংগ্রহ করছিলুম, তখন বারবার নরেন্দ্র দেবের কাছে গেছি, শুনেছি ‘ভারতী যুগ’-এর অনেক গল্প, রবীন্দ্রনাথ, মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ ও যতীন্দ্রমোহন সম্বন্ধে অনেক অন্তরঙ্গ স্মৃতিকাহিনী।
কাছের মানুষ হিসাবে তিনি আমাদের আকর্ষণ করতেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রতি ততখানি আকর্ষণ বোধ করিনি। নরেন্দ্র দেবের উপন্যাস পড়িনি। তাঁর ভ্রমণকাহিনীগুলি পড়তে ভালো লাগত। ওমর খৈয়াম, হাফিজ ও মেঘদূতের অনুবাদ পড়েছি, খুব ভালো লাগেনি। সত্যেন্দ্রনাথের ওমর খৈয়ামের অনুবাদও তেমন ভালো লাগে না। আসলে ‘ভারতী যুগ’ থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। একই গ্রন্থ একই শতাব্দীতে বারবার অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। অবশ্যই পুরনো অনুবাদেরও সাহিত্যিক মূল্য আছে, ঐতিহাসিক গুরুত্ব তো আছেই। তুলনায় ছোটদের জন্য লেখা গল্প-কবিতা অনেকদিন জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ রাখে। ‘গল্প বলি গল্প শোনো’ আজও ভালো লাগে।
আজকে আমরা পড়ি না, অনেক সময় হাতে পাই না বলেই পড়ি না, এমন অনেক বই হয়তো হঠাৎ পড়লে লেখকের শক্তিমত্তায় বিস্মিত হতে হয়। নরেন্দ্র দেব তেমন একজন লেখক। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে আমরা ভুলে যাইনি। হাতের কাছে বই পাইনি, পেয়েছি লেখককে। এবং প্রায়শ মনে হয়েছে, আমি কি ভাগ্যবান্! লেখার মধ্যে তিনি থাকবেন, ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা হবে, কিন্তু আমরা যারা তাঁর ব্যক্তিগত সান্নিধ্য পেয়েছি, তাদের কাছে এই মুহূর্তে নরেন্দ্র দেবের মৃত্যু অপূরণীয় অভাব বলে মনে হচ্ছে।
গ্রন্থপঞ্জী: বসুধারা (কাব্য)। রোবাইয়াৎ ই ওমর খৈয়াম ১৩৩৩। দিওয়ান ই হাফিজ। মেঘদূত। বোঝাপড়া (গল্প) ১৯২০। সুহাসিনী (গল্প) ১৯৩৮। রকমারি গল্প ( গল্প ) ১২৫৮। সিনেমা ১৯৩৪। সাহিত্যাচার্য শরৎচন্দ্র ১৯৩৮। সাহেব বিবির দেশে ১৯৫৬। রাজপুতের দেশে ১৯৫০। কবিতীর্থ ১৩৭৩। গরমিল (উপন্যাস ) ১৯২৫। খেলার পুতুল (উপন্যাস) ১৩৩৬। যাদুঘর (উপন্যাস) ১৩৬৭। আকাশকুসুম (উপন্যাস) ১৩৪৪। ভালোবেসেছিল যারা (উপন্যাস) ১৩৭২। মানুষের মন (উপন্যাস ) ১৩৭৩। পরাগ ও রেণু (উপন্যাস) ১৯৪৪। গৌতমের গতজন্ম। অনেক দিনের অনেক কথা ১৯৫৪। আনন্দমেলা। জন্ম-জন্মান্তরের কাহিনী ১৯৫৮। কিশোর গ্রন্থাবলী ১৩৭৫। গল্প বলি গল্প শোনো ১৩৭৫। সম্পাদিত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments