চিরন্তন পৃথিবী
আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ রাঙাপথ ছেড়ে কাজলী নদীর ধারে ধারে বরফ-কণার মতো সাদা ঘাসফুল পায়ে মাড়িয়ে ওরা দুজন হাঁটছিল, নওয়াজ আর তার স্ত্রী হোসেনা। পেছনে গ্রাম ছাড়িয়ে এসেছে। সম্মুখে বসতিশূন্য প্রান্তর, পাশে শীর্ণ নদীটি, আর ওপরে দিগন্ত প্রসারিত অনন্ত নীল আকাশ। মাসটা মাঘ। নওয়াজের গায়ে দামি ভারি ওভারকোট, হোসেনার গায়ে গাঢ় লাল রঙের কাশ্মিরি শাল। চেহারার কোমল ভাবে মনে হয় তারা যেন জগৎকে আনন্দোৎসব বলেই জেনেছে। তাদের কাছে আকাশের নীলিমা যেন সাগরের শীতল অতল জল; তাতে নেয়ে ওঠে দেহ সিক্ত এবং তার অসীমতায় হৃদয় প্রসারিত করা যায়।
হোসেনার সুন্দর দুটি চোখ নির্মলভাবে ঝিকমিক করছে। অদূরে রাঙা পলাশফুলের পানে চেয়ে সে মিষ্টি কণ্ঠে হেসে বললে, আসতে তুমি এত দেরি করলে কেন বল তো? সেই কবে থেকে কেবল আসছ-আসছ বলছ। আচ্ছা তুমি অমন কেন, যে-দিন আসবে বলে লেখ ঠিক সেদিনই আসতে পার না?
—আসব বলে না-এলে তুমি খুব ব্যথা পাও, না?
হোসেনা তার আনন্দোচ্ছল মুখখানা মুহূর্তে গম্ভীর করে তুলল। শান্ত গলায় বললে, না। পাই না।
—ও! বলে হোসেনার মুখের ওপর হতে মুখ ফিরিয়ে নওয়াজ দূরে নদীর ওপারের সবুজ ঘন বনরেখার পানে চাইলে, তার মুখচ্ছবি নির্লিপ্ত, প্রশ্নশূন্য।
—‘ও’ মানে? হোসেনা একটু চঞ্চল হয়ে প্রশ্ন করলে, ‘ও’ মানে কী?
—‘ও’ মানে? অতি সোজা। মানে, ও-ও-ও।... আচ্ছা হোসেনা, ওই যে বনের রেখা—
—বনের রেখা থাক। ‘ও’ বললে যে তুমি কী বুঝেছ বল। তুমি না এলে আমি বুঝি ব্যথা পাই না? আমি যেই বললুম অমনি তুমি বিশ্বেস করে ফেললে। আচ্ছা বুদ্ধি তোমাদের, প্রশংসা করতে ইচ্ছে করে।
মুখ ফিরিয়ে নওয়াজ মধুর কণ্ঠে হাসল। স্নেহ-কোমল গলায় বললে, কার মাথা যে স্বচ্ছ এখুনি তার প্রমাণ পাওয়া গেল। ... ও কী, রাগছ কেন?
—রাগব কেন? আমি তো বোকা, তোমার মাথা স্বচ্ছ, ঝকঝকে, স্ফটিকের মতো।
—তোমার মাথাও।
—দেখ আজ আমাকে রাগিয়ো না বলছি।
—তুমি রাগলে আজ রাতের গাড়িতেই আমি পালাব কিন্তু।
—পালাও না, পালাও। আমি বুঝি রাগছি?...
—যাঃ। মিছিমিছি মুখ ভেঙিয়ো না।
—আচ্ছা হোসেনা, মানুষের এত আনন্দ যে হয়, আগে তো জানতুম না। একটা তীব্র আনন্দ আমার অন্তর উদ্বেল করছে। আমার কী করতে ইচ্ছে করছে জান, হেসো না শুনে, ইচ্ছে করছে প্রবলভাবে নাচতে, না হয় নদীর অতলে গিয়ে নিশ্চল হয়ে শুয়ে থাকতে।
কয়েক মুহূর্ত নির্বাক থেকে হোসেনা মৃদু অস্ফুট কণ্ঠে বললে, আর আমার কী মনে হচ্ছে জান? মনে হচ্ছে, জগৎটা বিরাট ছলনা, শুধু ফাঁকি। তবু আনন্দ হচ্ছে। ছলনায় তো আনন্দ হয়।
নওয়াজ থমকে দাঁড়াল। বিস্মিতকণ্ঠে বললে, অদ্ভুত তো! কিন্তু কী জান, তোমার আনন্দটাই হয়তো খাঁটি, নিবিড়, আর আমারটা হালকা।
—যাকগে ওসব। ওগো ওদিকে একবার চেয়ে দেখনা, নদীর বাঁকের ওধারে সূর্য কেমন রং ছড়িয়ে ডুবছে, যেন বিশ্বমানবের অন্তর রাঙিয়ে তোলবার আয়োজন, যাবার আগে সবার অন্তর ছোঁবার চেষ্টা।
—আজ চতুর্দশীর চাঁদ, না?
কাজলী নদীর বয়ে চলার বিরাম নেই, ওদের দুজনের হাঁটারও যেন বিরাম নেই। তারা পথ ধরে-তো হাঁটছে না যে চলতে গিয়ে বাধা পাবে। রাঙা মাটির সংকীর্ণ পথ রইল তাদের জন্য যারা পথের শেষ, চলার সীমা কামনা করবে। নওয়াজ-হোসেনার শ্বসনও যেন সারা আকাশময় হচ্ছে; তাদের নিশ্বাস-প্রশ্বাস বুঝি আকাশের প্রতি কণা প্রতি বিন্দু স্পর্শ করছে, কাঁপিয়ে তুলছে। কোথা দিয়ে সূর্যের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গিয়ে ধরণীর বুকে চাঁদের স্নিগ্ধ আভা ফুটে উঠল, তারা লক্ষ্য করতে পারলে না। পথের কথা না-ভাবলেও তারা নদীর ধারটা কিন্তু ছাড়ছে না, কাজলীর স্রোত আর তাদের অন্তরের আনন্দ-স্রোত সাঁওতালদের জোড়া বাঁশির মতো এক
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments