এপিকের সারকথা
বের্টোল্ট ব্রেখট বিশ্বের নাট্যজগতে কিংবদন্তী, কিন্তু কলকাতায় এক কুসংস্কার। তাঁকে নিয়ে যে টানাহ্যাঁচড়া চলছে সে আর কহতব্য নয়। বিষ্যুৎবারের বারবেলার মতন তাঁকে টেনে আনা হয় যে কোনো নাট্যব্যর্থতার কৈফিয়ৎ হিসেবে। ধান ভানতে শিবের গীত এ-শহরে আছেন হতভাগ্য বে-বে। ব্রেখট্ নিজেকে 'ডের আর্মে বে- বে' নাম দিয়েছিলেন বোধ হয় কলকাতার কথা ভেবেই।
কলকাতার বিখ্যাত দৈনিক ও সাপ্তাহিকগুলিতে একদল লোক নিজেদের ‘নাট্যসমালোচক’ আখ্যা দিয়ে চলতি নাটকের সমালোচনা লেখেন। এঁদের অধিকাংশের মূর্খতা এবে সর্বজনবিদিত প্রবাদবাক্য। সেই মূর্খতার একটি উৎকট প্রকাশ ব্রেখট্-এর নামকে আশ্রয় করে। প্রযোজনায় সামান্য কিছু নতুনের আঁচ পেলেই তাঁরা 'ব্রেখটীয় রীতি' আবিষ্কার করেন। অভিনেতারা যদি প্রেক্ষাগৃহ থেকে মঞ্চে ওঠেন, তবে অনিবার্যভাবে ওই সদ্যসাক্ষর ক্রিটিক-রা লিখবেন, 'নাটকে কিছু ব্রেখটীয় পদ্ধতি লক্ষ করা গেল।' কস্মিনকালে ব্রেখট মঞ্চ ছেড়ে প্রেক্ষাগৃহে যাননি। সেটা এডমন্ড জোনস্ করতেন তিরিশের দশকে আর মস্কোয় অখলপকভ যাটের দশকে। এমনকী অভিনেতারা যদি নিজেরাই আসবাব মঞ্চে বয়ে আনেন। যেমন কোনো নাটকে ঘটেছিল। শুক্রবারের এক সাপ্তাহিক অবলীলাক্রমে লিখতে পারেন, 'ব্রেখটীয় রীতিতে অভিনেতারা নিজেরাই মঞ্চ সাজাচ্ছিলেন।' এই সকল গণ্ডমূর্খরা ছাপাখানা হাতে বলতে গেলেই আপনাদের চরিত্রগুলো অমন খড়ের পুতুল হয়ে পড়ে কেন? ডায়ালেটিকস কখনো দ্বন্দ্বহীন মানুষের কথা চিন্তা করতে দেয় না। নাট্যচরিত্ররা হবে নানা দ্বন্দ্বে কম্পমান, বিপরীত সব ভাবে ভরপুর। সাম্প্রতিককালে চীনের জু-ইয়াং এ লাইন থেকে সরে এসেছিলেন অনেক। মার্কসবাদী গবেষক লুকাচ চরিত্রচিত্রণে আরো বেশি দ্বন্দ্ব ও সংশয় দাবি করেছিলেন বলে জু-ইয়াং তাঁকে কঠোরতম সমালোচনা করে বলেন, বিপ্লবী নাটকে বিপ্লবী হবে সাদা, প্রতিবিপ্লবী হবে কালো, জনতাকে বিপ্লব বোঝাবার এটাই একমাত্র পথ। জু-ইয়াং সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তীব্রভাবে বিকৃত হন, কিন্তু সেটা এই মত প্রকাশের অপরাধে নয়- কেননা আজও বিশ্বে এই বিতর্ক চলছে এবং বহু সাংস্কৃতিক কর্মী এই স্পষ্ট সাদা-কালো তত্ত্বের সমর্থক। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে নামলেই বোঝা যায় দ্রুত কার্যকরী প্রচারের প্রয়োজনীয়তা।
ব্রেখট-ও বহু চিন্তার পর এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন- একত্রে বহু ভাব দেখালে নাটকে জটিলতা সৃষ্টি হয়, সাধারণ দর্শকের পক্ষে বিপ্লবতত্ত্ব বুঝতে অসুবিধা হয়। অন্যপক্ষে মার্কসবাদী হিসেবে, ডায়ালেক্টিশিয়ান হিসেবে তাঁর পক্ষে মানুষকে স্রেফ সাদা বা স্রেফ কালো মনে করা ছিল অসম্ভব। সমাধান হিসেবে তাঁর এপিক রীতি আবিষ্কার বা বলা চলে পুনরাবিষ্কার। প্রাচীন মহাকাব্য থেকে যেমন তিনি দূরত্ব সৃষ্টি ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন, মানুষকে কিভাবে দেখাব এ প্রশ্নের উত্তরও সেই মহাকাব্য থেকেই সংগ্রহ করলেন। শেক্সপিয়ারে চরিত্ররা যেমন দৃশ্য থেকে দৃশ্যে জটিলতর হয়ে উঠতে থাকে, অন্তর্দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত হতে থাকে, প্রাচীন মহাকাব্যে তা কখনো হয় না। অর্জুন বা কর্ণের বিপর্যয় নেই, তারা পাষাণপ্রতিমার ন্যায় বৃহৎ ও শান্ত। তাদের একেক পর্বে একেক ভাব। অর্জুন কখনো প্রেমিক, কখনো মহাবীর, কখনো বা যুদ্ধবিমুখ। কর্ণ কখনো নারী উৎপীড়ক, কখনো বীরশ্রেষ্ঠ, কখনো বা মাতৃস্নেহলোলুপ জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব। সাদা ও কালো দুই চিত্রই উপস্থিত হচ্ছে, তবে একত্রে ধূসর রং ধারণ করে নয়, আলাদা, পর পর। এতে তথাকথিত লজিকের প্রয়োজন হয় না। মহাকাব্য নিজের দূরত্ব বজায় রাখে বলে দৈনন্দিনতায় আবদ্ধ নয়। উপকথার যেমন জাগতিক লজিক লাগে না, মহাকাব্যেরও নয়। এই ফর্মকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক আলোয় সংশোধিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন ব্রেখট, থিয়েটারকে দিয়েছেন উপকথার বৃহত্ব, মহাকাব্যের গরিমা। মানুষকে ব্রেখট দেখিয়েছেন একেক দৃশ্যে একেক রূপে, প্রতি রূপকে আরো স্পষ্ট করে দিয়েছেন বৃহৎ লিখিত বিজ্ঞপ্তি মারফৎ: 'তখন কুরাজ ব্যবসায়ে নামলেন' বা 'য়োহানার ধর্মভাব' অথবা 'গালিলেও স্বর্গ উঠিয়ে দিলেন'। কুরাজ যে কখনো মাতা, কখনো কূট ব্যবসায়ী, কখনো ফিউদাল যুদ্ধবাজদের সমালোচক, কখনো বা হতভম্ব নির্বোধ এইসব একের পর এক চিত্র চলে যায় দর্শকচক্ষুর সামনে দিয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments