একটু সময় রাখি, শুধু দুজনের জন্য

‘সকালে ঘুম থেকে উঠে আমাদের দুজনকে ছুটতে হয় কলেজের পথে। দুজনের গন্তব্য থাকে একই, আমরা একই কলেজে শিক্ষকতা করছি। আমার বিচরণক্ষেত্র গাছপালা নিয়ে, আমি বোটানির শিক্ষক। ওর জগৎ আলো, মহাকাশ এসব নিয়ে। আমার স্বামী পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক।’ এভাবেই নিজেদের জগতের কথা বলছিলেন সিরাজুুম মুনিরা। তিনি ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজে সাত বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বোটানিতে তিনি অনার্স-মাস্টার্র্স সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষাজীবন শেষে ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজেই চাকরিজীবন শুরু। এখানেই সহকর্মী হিসেবে মোহাম্মদ এনামুল হকের সঙ্গে পরিচয়। চাকরিতে যোগদানের ৯ মাসের মাথায় পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন তাদের চারজনের পরিবার। তিনি বলেন, ‘আমাদের পেশা একই হওয়ায় সুবিধা অনেক বেশি। আমাদের কাজের জায়গা এক হওয়ায় অফিসের কাছাকাছি বাসা নিতে পেরেছি। সহকর্মী হিসেবে এবং বাসায় জীবনসঙ্গী হিসেবে সব সময়ই স্বামীর কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছি। দুজনই আমাদের কাজের সুবিধা-অসুবিধাগুলো খুব সহজে বুঝতে পারি। আবার কাজের ক্ষেত্র এক হওয়ায় মাঝে মধ্যে কিছু বাধার সম্মুখীনও হতে হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহকর্মীদের কাছ থেকে নানা ধরনের সাহায্য আমরা পেয়ে থাকি। সহকর্মী হিসেবে সেই একই পরিমাণ সাহায্য যখন আমি আমার স্বামীর কাছ থেকে পাচ্ছি, তখন নানা মন্তব্য বা কথাও শুনতে হয়। অনেকেই মনে করেন, স্বামীর কাছ থেকে আমি হয়তো একটু বেশি সুবিধা পাচ্ছি। যদিও বিষয়টি সেরকম নয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বন্ধুত্বের সম্পর্ক। দুজন বন্ধুর মধ্যে যেমন ফলাফল নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকে, তেমনি একই পেশার ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতাটি থাকে। একজন আরেকজনের পথ রোধ করে নয়, বরং পাশে থেকে সেই প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। আমাদের বড় সন্তানের বয়স এবার চার বছর হতে চলল। এ বছর ও স্কুলে ভর্তি হয়েছে। দুজনই তাই চেষ্টা করে কাজের মাঝে ওকে স্কুলে আনা-নেওয়া করে থাকি। পড়ানোর পাশাপাশি লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছি। জীববিজ্ঞান প্রথম পত্রের ওপর আমার লেখা একটি বইও রয়েছে। লেখালেখির ব্যাপারে সব সময়ই ওর কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি। পরে আরও বই লেখার ইচ্ছা আছে।

মোহাম্মদ এনামুল হকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার দৃষ্টিতে সমপেশায় দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্র্স সম্পন্ন করে এখন ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজে আছেন। আগে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজেও শিক্ষকতা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা একই কলেজের শিক্ষক। কিন্তু আমি এমন দম্পতিকেও চিনি, যারা একই কলেজে একই বিষয়ের শিক্ষক। তাদের সুবিধা আরও বেশি। একই কলেজে শিক্ষক হওয়ায় বিভিন্ন পরীক্ষার ডিউটি, ক্লাসের সময় একে অপরের সুবিধা অনুযায়ী ভাগ করে নিতে পারি। ছুটির দিনগুলো সন্তানদের দেওয়ার চেষ্টা করি। পয়লা বৈশাখসহ এ ধরনের অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে আমাদের দুজনকেই কলেজে যেতে হয়। তাই এ দিনগুলো সন্তান সন্তানাদি নিয়ে কলেজেই আমাদের কাটে। আমাদের দুজনের পড়ানোর বিষয় আলাদা হলেও আমাদের ছাত্রছাত্রীরা থাকে একই। প্রতিবছর নতুন নতুন ছাত্রছাত্রী আসে। আমাদের সাথে পরিচিত হয়। বছর শেষে নানা সুন্দর স্মৃতি, নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে যায়। নিজেদের মধ্যে নানা গল্প, আলোচনার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা আমাদের পরিবারেরই অংশ হয়ে ওঠে। প্রায় সব বছর কলেজ থেকে আমাদের শিক্ষাভ্রমণের আয়োজন করা হয়। প্রতিবারই দুইশ-আড়াইশ জন ছাত্রছাত্রী যায়। তাদের সাথে শিক্ষক হিসেবে আমরা ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন থাকি। এ পর্যন্ত দুবার আমি শিক্ষাভ্রমণে গিয়েছি। এর মধ্যে একবার আমি এবং আমার স্ত্রী আমরা দুজনই গিয়েছিলাম সুন্দরবনে। একই কলেজ হওয়ায় এমনিভাবে আরও অনেকবারই হয়তো আমাদের একসাথে বেড়ানোর সুযোগ হবে।

সমপেশায় কাজ করছেন, সংসার করছেন। দুজনেই ব্যস্ত। তাহলে এত কাজের মধ্যে আপনাদের রোমান্স বলতে কি কিছু নেই? উত্তরে তারা মিষ্টি হেসে বলেন, মনের গহিনে একটু সময় রাখি শুধু দুজনের

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice