জাহাজী
এঞ্জিন মৃদু-মৃদু আওয়াজ করতে শুরু করেছে। স্টোকহোল্ডে কয়লাওয়ালাদের মুখ লাল হয়ে উঠেছে: তাদের সামনে যে বিরাট অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠেছে—তারই তাপে ঝলসাচ্ছে ওদের মুখ। ভোর নাগাদ জাহাজ ছাড়বে। কিন্তু মাল তোলা এখনো শেষ হয় নি; কার্গো-উইঞ্চে একঘেয়ে আওয়াজ হচ্ছে: ঘর ঘর ঘর। ওধারে ডকের আবরণ দেয়া-আলোর মধ্যে রহস্য, অস্পষ্ট কোলাহল, আর ধোঁয়া।
রাতের শেষাশেষি। বৃদ্ধ করিম সারেঙ্গ কেবিন হতে বেরিয়ে এল—তার ক্ষুদ্র চোখে ঘুমাবসানের ঔজ্জ্বল্য ও স্বচ্ছতা। জাহাজ কাঁপছে মৃদু-মৃদু। ওপরে ফানেল দুটো দিয়ে ধোয়ার শীর্ণ রেখা নিষ্কম্পভাবে ঋজু হয়ে উঠে হাওয়াশূন্য কালো আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। করিম সারেঙ্গ ঘুরে এল এদিকে, দেখলে গ্যাঙ্গওয়ে এখনো তোলা হয় নি। কোণে আবছা অন্ধকার; সে-অন্ধকারে গ্যাঙ্গওয়ের পাহারায় একটা মূর্তি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক মুহূর্ত থম্কে দাঁড়াল সারেঙ্গ, তারপর তীব্র গলায় প্রশ্ন করলে:
—ইবা কন?
সুখানি মজিদের চোখ হয়তো তন্দ্রায় ভরে উঠেছিল, সারেঙ্গের প্রশ্নে সে সচকিত হয়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে উত্তর দিলে:
—আঁই, মজিদ।
আকাশে তারাগুলো ম্লান হয়ে উঠেছে, কেবল শুকতারা দপদপ করছে উজ্জ্বলভাবে। ওধারে ডকে এখনো প্রচুর মাল। মরচেধরা পুরোনো কার্গো-উইঞ্চটা ঘরঘর করছে অবিরাম ডক থেকে মাল তুলে ঘুরে এসে হ্যাচওয়ের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে একটু পরে আবার শূন্য অবস্থায় লকলক করে বেরিয়ে আসছে।
জাহাজটা মালবাহী। তাই খোলা খোলা। গলি দিয়ে স্টারবোর্ডে গিয়ে আরেক জায়গায় থমকে দাঁড়াল সারেঙ্গ। ওপরে চার্টরুমের আবৃত উজ্জ্বল আলো নজরে পড়ল। বন্ধ জানালার শার্সিতে কার ছায়া বিকৃত হয়ে পড়েছে। চোখ ছোট করে তাকাল সারেঙ্গ: হয়তো থার্ডমেটের ছায়া।
তারপর সারেঙ্গ আবার ফিরে এল কেবিনে। সেটি একধারে বলে তাতে একটি পোর্টহোল রয়েছে। কেবিনে আলো, বাইরে তখনো রাত্রির অন্ধকার বলে তাতে ঘরের ছায়া, সারেঙ্গের প্রতিমূর্তি। তবু ক্ষুদ্র উজ্জ্বল চোখে বাইরে তাকাল সে: আকাশ যেন স্বচ্ছ হয়ে আসছে ক্ৰমে-ক্রমে, অতি নম্র নির্মল পবিত্রতা প্রকাশ পাচ্ছে বাইরের জগতে। এ-সময়ে করিম সারেঙ্গ বরাবর স্তব্ধ হয়ে থাকে। দিন শুরু হবে শীঘ্র, জাহাজী জীবনের অনির্দিষ্ট দিনগুলোর একটি দিন হবে শুরু: এবং রাত ও দিনের এ সন্ধিক্ষণে শুদ্ধচিত্তে সে স্তব্ধ হয়ে থাকে, আর কেবিনের নির্জনতা ও নীরবতার মধ্যে কেমন কোমল হয়ে ওঠে তার ভেতরটা। লস্করদের কাছে তার ব্যক্তিত্ব বড় জমকালো। তারা তাকে শ্রদ্ধা করে ভয় করে। সারেঙ্গও অনুভব করে কর্তৃত্বের ভারিত্ব। কিন্তু এ-সময়ে তার সে-মন সহজ হয়ে পড়ে, দিনের মৃদু অথচ বিস্ময়কর বিকাশের কাছে অতি ক্ষুদ্র মনে হয় নিজেকে। খোদা আছেন: সর্বশক্তিময় খোদা। তাঁর অস্তিত্ব নিঃসঙ্গ করিম সারেঙ্গ অনন্ত আকাশের তলে ও অকূল সমুদ্রের মধ্যে বিচিত্রভাবে অনুভব করেছে, এবং এ-অনুভূতিতে কখনো কখনো তার ব্যক্তিত্বে—ভারি মন-ও কেমন বেদনার আনন্দে কেঁদে ওঠে। রাত্রির শেষ। প্রখর সূর্যালোকের তলে বাস্তব জগতের সাথে এখনো দেখা হয় নি: নির্মল প্রশান্তিতে সারেঙ্গ ফজরের নামায পড়ে। শুভ্র দাড়িতে আবৃত গৌর মুখ পবিত্রতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, এবং গভীর এবাদতী নিবিষ্টতায় তার ক্ষুদ্র চোখ—যে-চোখের তীক্ষ্ণতায় লস্কররা ভীত চমকিত হয়—সে-চোখ বুজে থাকে নিবিড়ভাবে। খোদা আছেন: সর্বশক্তিমান বিশ্বনিয়ামক খোদা।
ধ্যানমগ্ন মুহূর্ত পিছলে পিছলে যায়, ক্রমে ক্রমে ওধারে জানালা গলে এবার আলো আসে ভেতরে। যে-পবিত্রতা একসময় সূর্যালোকের কুৎসিত প্রখরতায় নিঃশেষ হয়ে যাবে, সে-পবিত্রতা এবার ঘোষণায় পরিণত হচ্ছে। সারেঙ্গের চোখ ছলছল করে, নিমীলিত চোখের প্রান্তে তার আভাস স্তিমিত হয়ে ওঠা বৈদ্যুতিক আলোতে চকচক করে। মানুষ জানে না—অনুভব করে না খোদাতালার অস্তিত্ব। সূর্যালোকে মানুষ দুনিয়া দেখে, দেখে পরস্পরের পাপ-পঙ্কিলতা, এবং খোদার দান সূর্যালোক হয়ে ওঠে কদর্য। যে-অশ্রু নিমীলিত চোখের প্রান্ত শুধু চকচক করছিল, ছুরা ফাতেহা পড়তে গিয়ে এবার তা ছাপিয়ে ওঠে। জাহাজী জীবনই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments