সাহিত্য পাঠকের প্রতি নিবেদন
সম্প্রতি পত্রান্তরে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ পড়লাম। তাতে সম্পাদকীয় লেখক আক্ষেপ করেছেন যে, বর্তমান বাংলাসাহিত্যে ভালো জ্ঞানমূলক বইয়ের আর কদর নেই। কদর নেই বলে, প্রকাশকেরাও আর ওই জাতীয় বই তেমন আগ্রহ করে ছাপাতে চান না। একখানা উৎকৃষ্ট সৎ গ্রন্থের মাত্র পাঁচ শত কপি বাজারে কাটতে অনেক বৎসর লেগে যায়। প্রকাশকেরা ব্যবসায় করতে বসেছেন, বই বিক্রি করে কিছু অন্তত মুনাফা তাঁরা করতে পারবেন এই আশাতেই তাঁদের পুস্তক ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হওয়া। নিছক সৎ গ্রন্থ প্রকাশের আকর্ষণে তাঁদের সৎ গ্রন্থ প্রকাশ করতে বলা তাঁদের কাছ থেকে একটু বেশী আশা করার সামিল হয়। সৎ গ্রন্থ প্রকাশ রূপ আদর্শবাদের পোষকতা করতে গিয়ে কেবলই যদি তাঁদের লোকসান দিতে হয় তবে প্রাণ ধরে তাঁদের সৎ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য অনুরোধ করাও যায় না, সেটা সঙ্গতও হয় না। আর যাই হোক, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার জন্য তো কেউ ব্যবসায়ে অবতীর্ণ হননি।
বর্তমান বাংলা সাহিত্যের এই যে সমস্যা, এই সমস্যার সমাধানের উপায় কী? এটা আজ অতি প্রত্যক্ষ যে, সম্পাদকীয় লেখক যাকে 'ভূষিমাল' রূপে অভিহিত করেছেন সেই তথাকথিত সৃষ্টিমূলক গল্পোপন্যাসের প্লাবনে বাংলাসাহিত্য ভেসে যাবার উপক্রম হয়েছে। প্রকাশকদের ঘর থেকে উপনাস বা গল্পের বই যদি ছাপা হয় আশিখানা, তো সব রকমের জ্ঞান-বিজ্ঞানমূলক বই একত্র মিলিয়ে ছাপা হয় মাত্র কুড়িখানা। অর্থাৎ শতাংশের হিসেবে দুই ধরনের বইয়ের অনপাত হলো ৮ঃ ২। স্বর্গত রাজশেখর বসু মহাশয় একবার বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিভিন্ন শ্রেণীর পুস্তকাবলীর সংখ্যানুপাত প্রকাশ করেছিলেন। তার থেকে দেখা যায়, তাঁর হিসাব অনুযায়ী নাটক, নবেল, কাব্য, রম্য রচনা জাতীয় 'সুকুমার সাহিত্য' আখ্যাধারী বইয়ের গড় হলো সত্তর আর অবশিষ্ট ভাগে পড়ে অন্য সকল শ্রেণীর বইয়ের সাকুল্য সংখ্যা। বসু মহাশয়ের পরলোকগমনের পর অবস্থায় আরও অবনতি হয়েছে। পুস্তক প্রকাশন জগতের নানা ধরন-ধারন লক্ষ্য করে এবং অন্যান্য আরও কতিপয় অনুমানের ভিত্তিতে আমরা আমাদের উপরের সিদ্ধান্তে (৮:২ অনুপাত) উপনীত হয়েছি। এই অনুপাত-নিরূপণে যদি ভুল হয়ে থাকে তো মনে করতে হবে যে সেই ভুল ন্যূনতার দিকেই হওয়া সম্ভব, অতিরঞ্জনের দিকে নয়। আমরা সংখ্যাতত্ত্ববিদ নই, সংখ্যাতত্ত্ববিদরাই শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল হিসাব উপস্থাপিত করতে পারেন।
এই যে বাংলা পুস্তক প্রকাশন জগতের একটা চিত্র উপস্থিত করা গেল, এর ভিতরের কথাটা কী? ভিতরের কথাটা কি এই নয় যে, ভূষিমালের দৌরাত্ম্যে ও বাহুল্যে সাহিত্যের ক্ষেত্র থেকে সরেস মাল অন্তর্হিত হবার উপক্রম? অর্থনীতির সূত্রে পাই: খারাপ টাকা নাকি ভালো টাকাকে বাজার থেকে খেদিয়ে বিদায় করে। এও কি সেই ধরনের একটি ব্যাপার নয়? অধম মুদ্রা কর্তৃক উত্তম মুদ্রার এইরূপ ক্রমিক বিতাড়ণ যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতেই থাকে তো এমন দিন কি খুব সুদূর, যখন বাংলা ভাষায় পড়বার মতো জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না, বাজার জুড়ে থাকবে শুধু উপন্যাস আর উপন্যাস আর উপন্যাস এবং অনুরূপ ধরনের বই? অবস্থাটা কল্পনা করতেও হৃৎকম্প উপস্থিত হয়।
এ কথা অনুমান করবার কোনোই হেতু নেই যে, বর্তমান লেখক, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক প্রভৃতি সুকুমার সাহিত্যের বিরোধী। মোটেই তা নয়। বরং সত্যিকারের ভালো উপন্যাস, গল্প, নাটক জাতীয় বইয়ের তিনি একজন উৎসাহী পাঠক। কিন্তু তার মানে এ নয় যে, তাঁর মনোযোগ শুধু এই ধরনের পুস্তকপাঠেই নিবদ্ধ, তিনি সমপরিমাণ উৎসাহ নিয়ে, তেমন তেমন বইয়ের বেলায় অধিকতর উৎসাহ নিয়ে, ইতিহাস, ধর্ম, রাষ্ট্রনীতি, সমাজ-বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের বইও পড়েন। পাঠকের বিকাশের পক্ষে তাঁর পাঠক্রিয়ায় এই বিষয় বৈচিত্র্য অতীব আবশ্যক। তা নয় তো মন একপেশে হয়ে যায়, সব দিকে মাত্রাসাম্য রেখে মনের বাড় হয় না।
আর তা ছাড়া কল্পনাই তো মানুষের একমাত্র
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments