এক্স-সোলজার

ছোটো দোতলা বাড়ি, তবুও আমাদের পক্ষে বেশি হয়ে যায় বলে নীচের ঘরে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় একজন ভাড়াটে আনলাম।

লোকটির নাম শৈলেশ, সঙ্গে স্ত্রী আর চারটি ছেলে-মেয়ে।

যেদিন তারা প্রথম এল তখন রাত্রি, লোকটাকে সেদিন আর দেখিনি। কিন্তু পরদিন কলের পাড়ে মুখ ধুতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম তার চেহারা দেখে। মিশকালো তার গায়ের রং, চোখদুটি বড়ো, লম্বা আর ভয়ানক জোয়ান, সমস্ত গা লোমে ভর্তি, মাথায় চুল উলটানো। তার সবচেয়ে বিস্ময়কর যা তা হচ্ছে তার গোঁফ-জোড়া। স্যার আশুতোষেরও বোধ করি এমন গোঁফ ছিল না। নিজেকে ধন্যবাদ দিলাম, এই ভেবে যে রাতে না দেখে ভালোই করেছি, দেখলে হয়তো মূর্ছা যেতাম। এখানে বলে রাখা দরকার যে, তাকে আমার নীচের ভাড়াটে ঠিক করেছিলাম, আমি নিজে দেখে নয় কথাবার্তা চলেছিল অন্যের মধ্যস্থতায়, আর সে বাসাও দেখে গিয়েছিল আমার অ-সাক্ষাতেই।

সে যাক।

আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল। বাইরেরটা দেখে প্রথম যা ভেবেছিলাম তেমন কিছুই নয়। লোকটা গল্প করতে পারে খুব, যখন একবার আরম্ভ হয় কিছুতেই আর শেষ হয় না। কথা শুনে যা বুঝলাম তাতে অবস্থা ভালোই মনে হয়।

একদিন রাত্রে নীচ থেকে একটি ছেলের ভয়ানক কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। অনেকক্ষণ অমন চিৎকার শুনে আর থাকতে না-পেরে বারান্দায় এসে ডাকলাম,—

শৈলেশবাবু, ও মশাই—

শৈলেশ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? ছেলেটাকে অত মারছেন কেন?

—আরে মশাই! এমন দুষ্টু ছেলে কারুর ঘরে নেই। সন্ধে থেকে বলছি পড়তে বসতে, না, ওর কানেই যায় না! আজ বাদে কাল পরীক্ষা, এখনও পর্যন্ত ‘নাউন’ কাকে বলে জিজ্ঞেস করলে হাঁ করে বসে থাকে, আবার ইদিকে পড়তেও বসে না। তাই এমন রাগ হল যে খুব মার দিলাম।

—তা বলে কি এমনভাবে মারতে আছে?

শৈলেশ চেঁচিয়ে বললেন, কী জানেন, আমরা ওর চেয়ে বড়ো হয়েও বাপের কাছ থেকে অনেক বেশি মার খেয়েছি। এমনকী, হাত-পা বেঁধে পর্যন্ত ঘরের ছাদে ঝুলিয়ে রেখেছে। এত শাসন ছিল। আর সেই শাসন পেয়েই-না আজ ওসবকে ভয় করে চলি! আমি চাই, আমার ছেলেও তেমনি হোক। লোকে বলুক হ্যাঁ, এ ছেলে শৈলেশ চক্রবর্তীর নাম রেখেছে বটে।

ছেলেটার কান্নার শব্দ ক্রমে কমে আসছে।

নীচের থেকেই শৈলেশ বললেন, দেখুন চক্রবর্তী-পরিবারের আমরা তখন একটি-দুটি নয়, পঞ্চাশটা ভাই ছিলাম। শুনে আশ্চার্য হবেন। আমার বাবারা ছিলেন পাঁচ ভাই, সব একসাথে। আজকালের মতো নাকি যে দুটি ভাইয়েতেও একান্নবর্তী সংসার চলে না? হাঁ, তখন আশেপাশের সমস্ত গাঁ আমাদের নামে ভয় পেত। এত নাম ছিল চারদিকে।

হাসি পেল খুব, না-হেসে বললাম এখন আপনার আর ভাই সব কোথায় গেল?

এখন কি আর সব একখানে আছে! এই তো ধরুন, আমি এখানে, কেউ কলকাতায়, কেউ থাকে চাটগাঁ, কেউ জলপাইগুড়ি, কয়েক ভাই গাঁয়ের বাড়িতে থেকে জমি-জমা দেখছে, আর কয়েকজন মারা গেছে।

শৈলেশ অনায়াসে একটা হিসাব দিলেন, আমি হাসি চেপে চুপ করে গেলাম। সেদিন এই পর্যন্ত।

তারপর এক রবিবার দুপুরবেলা, আমি বসে একটা বই পড়ছি। সুরমা গেছে খেতে। বাইরে ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম।

—কী করছেন? শৈলেশ কিছু না-বলেই একটু হেসে ঘরে এসে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন।

দুপুরবেলা সুরমার বদলে এই লোকটির নিমন্ত্রণহীন উপস্থিতিকে উৎপাত ভেবে বিরক্ত হলাম। এখন দু-ঘণ্টা বসে অনর্গল বকুনি শুনতে হবে আর কী? কিন্তু মুখে কিছু না-বলে বললাম, এ কয়দিন আপনাকে দেখিনি যে?

—আর বলেন কেন মশাই! গিয়েছিলাম বন্ধুর বিয়েতে, ধরে নিয়ে গেল, কী আর করি? মেয়ের বাড়ি গাঁ-দেশে। কিন্তু গিয়ে দেখি একেবারে অজ পাড়া-গাঁ, যত ছোটোলোকের আড্ডা। এর চেয়ে খারাপ জায়গা

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice