আমরা তিনজন
ছেলেগুলি যা দুষ্টু! কাল রাতে কানের কাছে কতক্ষণ ক্যান্স্ত্রা পিটিয়েছে, আজও পিটিতেছে। মানা করিলে জোরে বাজায়, কিছু না বলিলে আরও জোরে বাজায়। এমন খেলা আর খেলে নাই বুঝি। প্রত্যেকটি মধ্যযুগের দিগম্বর সম্প্রদায়ের বংশধর, মাথার চুল রোদে-পোড়া, হাতে-পায়ে বড়ো-বড়ো নখ। মুখে প্রৌঢ়া আর বৃদ্ধা মেয়েদের বিবাহের গানের অনুকরণ করিতেছে, হাতে ক্যান্স্ত্রা পিটিতেছে।
মাস্টার ছেলেটি ভালো, বড় বাধ্য। ঐশ্বর্যের লীলাভূমি শহরে অন্নের সন্ধানে আসিল, অন্ন পাইল না, কিন্তু পাইল আমাকে, তদবধি আমাকে ধরিয়াই আছে। আমি বৃক্ষ, সে লতা। মাস্টার ছেলেটি ভালো, অর্থাৎ সোজা কথায় যাকে বলে গুড বয়। মাথার চুল হইতে পায়ের নখ অবধি এমন একটি চেহারা যে, আঠারো হইতে পঁয়ত্রিশ অবধি যে কোন বয়সেরই ধরিয়াই নিই না কেন। মুখে এমন একটি বিরক্তির ভাব, অথচ সেটা তাহার অকৃপণ হাসিরই রূপান্তর। জিজ্ঞাসা করিয়াছিল ঐসব মাতৃ-পিতৃহীন বালক-সম্প্রদায় অমন দুষ্টুমি করিতেছে কেন, কান ঝালা-পালা হইয়া গেল তো।
বলিলাম, বুঝলে মাস্টার, বিয়েটা ধর্ম, আর আমরা সবাই তাতে ধর্মপ্রাণ। এ থেকে সামান্য দু-একজন ছিটকিয়ে পড়ে বটে, সেটা ব্যতিক্রম। কিন্তু যারা ধর্মপ্রাণ, তাদের কথাই বলি। তুমি একটা তর্ক জুড়ে দিলে, অবশ্যি তর্ক তুমি করো না—রেগে লাল হয়ে বললে, খেতে দিতে পারবে না একমুষ্টি, তবে বিয়ে করে কেন? বিয়ে করা যেন সখ! নিজের পেটেই জোটে না ভাত তা আবার আর একজনের পেটের ভার নেওয়া। আবার কার কী দোষ, ওরা যদি নিজেরাই ইচ্ছে করে নিজেদের দুঃখ বাড়ায়। অশিক্ষা, অশিক্ষা! তাহলে আমি বলি, অশিক্ষার কথা না, সেটা ফাঁকি, সেটা সমষ্টির সমস্যার ওপর ব্যক্তির অর্থহীন মতামত। তোমার টাকা আছে বলে তোমার বিয়ে করবার সখ আছে, আর আমি গরিব বলে আমার সখ নেই, এমন যুক্তি তুমিও বোধকরি মানবে না। তুমি বললে, অনুকূল পারিপার্শ্বিক অবস্থা আর শিক্ষা আমার সহায়। তাছাড়া সন্তান পালনের অক্ষমতা—কিন্তু এরপরে আর তোমাকে বলতে দেবো না, বাধা দিয়ে বলবো, চুপ চুপ, মহাপুরুষের চেহারা ধরে অমন কথা আর বলো না, আমি ভয় পাই, থিয়োরির প্রচারক হয়ে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ বেদনাকে অমন ভুলে যেয়ো না, আমি দুঃখ পাই, যা তোমার অনুভূতি, তা আর একজনের হবে না, তেমন কথা বলো না—আর একটু নিচে নেমে এসো ভাই। তারপর হয়ত তুমি সত্যি একটু নিচে নেমে আসবে, বলবে, বিয়ের কথা না হয় হলো, ডজনখানেক সন্তান না হলে কি সংসার করা হয় না? তা হলে আমার ভয়ানক হাসি পাবে, হাসি থামিয়ে যদি নেহাৎ চুপ না করে থাকি, তবে বলবো, সেই পন্থা তোমরাই জানো শুধু তার খরচ বহন করতে তোমরাই পারো শুধু—সাবধান, নীতির কথা বলো না, তা হলে মারই দেবো। আরও নিচে নেমে এসো ভাই, আর একটু—? কিন্তু আসল কথা, এটা তর্ক, ধরো, তুমি আর আমি একটা তর্ক জুড়ে দিলাম, তা ছাড়া আর কিছুই নয়। রোদ বাড়ছে, গলা শুকিয়ে এসেছে, আর যা গরম একটা বিড়ি খাও। লক্ষ করিয়াছি, তাহার হাসিরই রূপান্তর বিরক্তিভরা মুখে কিছুটা বিস্ময়ের চিহ্ন, নিজের বিড়িটাতে আগুন ধরাইয়া বলিলাম, নাও, তাড়াতাড়ি নাও, এই কাঠি নষ্ট হলে আর এক কাঠি খরচ করতে পারবো না কিন্তু! নাও—তাহার ধরানো হইলে আবার বলিলাম, খুব আশ্চর্য হয়েছো, না?
অমনি মাস্টারের মাথা নত হইয়া আসিল, মুখ হইতে বিস্ময়ের চিহ্ন মুছিয়া গেল, মাস্টার অতি বিনীতভাবে বলিল, আজ্ঞে না।
—মাস্টার, জিজ্ঞেস করেছিলে, ছেলেগুলি এত দুষ্টু হয়ে উঠেছে কেন, কান ঝালা-পালা হয়ে গেল তো! কিন্তু ওটা নেহাৎই খেলা নয়, ওটা বিয়ের বাজনা, কাল বেজেছে, আজও শোনা যাচ্ছে। ঘুম হয়নি বলে অভিযোগ করো না ভাই, কারণ ড্রাম,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments