অমিল
সোমেন চন্দ
অভিনয় শেষে গ্রিনরুমে এসে সকলে সমবেত হয়েছে। স্থান অল্প, লোক বেশি। অভিনয় ব্যাপারে এত পরিশ্রমের পরেও অজস্র কথার গতিতে মুখের রং তোলার বা পোশাক-পরিচ্ছদ বদলানোর তাড়া নেই।
স্থান-স্বল্পতা সত্ত্বেও ঘরের এক কোণে একটু নিরিবিলি আছে। মেয়েদের সেখানে আনাগোনা কম, কিন্তু ভারতী এসেই সে স্থানটুকু বেছে নিয়েছে। অত গোলমাল আর ভালো লাগে না। ভারতী তাই একটা লোহার চেয়ারে চিবুকে হাত রেখে বসে মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চুপ করে আছে।
কিন্তু কোনো রকমেই রেহাই পাবার উপায় নেই। রেখা কোত্থেকে এসে ধরল।
—ইস, ভাই তোকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। এমন করে একলাটি বসে আছিস কেন বল তো?
ভারতী হেসে বলল, ‘এমনি!’
—‘তোর সবই তো এমনি, যে যাক, একটু বসতে দে আগে, আমি আর দাঁড়াতে পারছিনে।’
—জায়গা কোথায়?’
—‘একটু সরলেই হবে—’ কোনো রকমে জায়গা করে রেখা তার পাশে বসল। রানির ভূমিকাভিনয়ে ছিল ভারতী। তাই জমকালো হয়ে সাজতে হয়েছিল। রানির পরিধানযোগ্য অনেক ধরা-চূড়া। কিন্তু একটি জিনিসও ভারতীয় নিজের নয়, সব এই রেখার দেওয়া। সে কোথায় পাবে? মেয়েরা তাকে একদিনের জন্যও একটা ভালো কাপড় পরতে দেখেনি। তারা জানে, এর মূলে কী!
ভারতীয় বলল, ‘তোর জিনিসগুলো—’
রেখা আর বলতে দিল না, তার মুখে হাত চেপে বাধা দিয়ে বলল, ‘ওসব কে এখন শুনতে চাইছে? এক সময় দিলেই হবে।’
—‘না দামি জিনিস তো!’
—‘ইস, আমি পারিনে। এখানে কি এমন কেউ নেই যে আমাকে এই হড়হংবহংব ঃধষশ থেকে রেহাই দিতে পারে।’ রেখা অভিনয় ভঙ্গিতে বলল।’
ভারতী নীরবে হাসল।
ভারতীকে জড়িয়ে রেখা বলল, ‘তোর মতো রূপও যদি আমার থাকত তবে দেখতিস।’
কথাবার্তায় রেখার প্রকৃতিই ওই রকম, সব সময় কেবল সৌন্দর্যচর্চা। একটু পরে বলল, ‘থিয়েটার কেমন হল?’
—‘দু-চার বছরেও এমন হয়নি।’
খানিকটা পরে: ‘অঞ্জন আসবে লিখেছে।’
ভারতী বলল, ‘শুধু এই? আর কী লিখেছে বল্?’
—‘লিখেছে: পাইনের মর্মর ভুলতে পার কি? আমাকে তো অনেকগুলো দিনের কথা মনে করিয়া দেয়, তাদের ভাষায় আমি এক অতিপরিচিত ভাষাই শুনতে পাই। আমার ভালো লাগে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তটিকে কী নামকরণ করব বলো, যখন মনে হয়, যা অতীত তা তো আর আলোক নয়, শুধু অন্ধকার।’
অন্যদিকে চেয়ে কতকটা স্বগতভাবে রেখা বলল, ‘এমন স্বভাব, এমন সুন্দর হাসি!’
ভারতী পরিহাসচ্ছলে বলল, ‘কালো অঞ্জন মেখেছিস চোখে! কিন্তু আমার তো হিংসে হওয়ার কথা।’
—‘তা হোক, তাতে আমার দুঃখ নেই। কিন্তু আমার ভয়ানক খিদে পেয়েছে।’ রেখা আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘কেন, তুই খাসনি? চা?’
—‘ওসব আমার ভালো লাগে না।’
—‘তুই একটা অদ্ভুত প্রাণী। চল্, এলাদির কাছে গিয়ে বলি।’
ভারতী তার হাত ধরে বলল, ‘দোহাই তোর, তুই এখান থেকে যাসনে। অত গোলমালে আমার মাথা ধরে গেছে। এখানে বেশ ভালো আছি, তুই বরং গল্প কর।’
ভারতী খানিক থেমে বলল, ‘এলে কিন্তু আমায় দেখাবি।’
—‘আচ্ছা।’
—‘তখন আমার দুঃসময়। তুই তো আমাকে ভুলেই যাবি।’
—‘তা তুই ভাবতে পারিস, তোর মতো নেমকহারাম দুটি আছে।’
ভারতী আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘কী দোষটা করেছি শুনি?’
—‘দোষ? কতদিন বললাম আমাদের বাসায় যেতে। বন্ধু বলে আমারই ঠেকা বেশি, না?’
—না, কে বললে অমন কথা? কখনও নয়। ঠেকা আমারই বেশি। কিন্তু তোকে আমাদের বাসায় নিইনে কেন জানিস্? সেখানে গেলে তুই শ্বাসরোধে যন্ত্রণায় মারা পড়বি।
রেখা গম্ভীর হয়ে বললে, ‘তুই আমাকে ঠাট্টা করিস?’
—‘মোটেই না। জ্বলন্ত সত্য কথা।’
রেখা গম্ভীর হয়েই রইল।
ভারতী তার হাতটি বুকের কাছে টেনে বলল, ‘কাল এক মজার ব্যাপার ঘটেছিল। শেষরাতে হঠাৎ জেগে দেখি, ভয়ানক বৃষ্টি হচ্ছে। ঝর ঝর একটানা শব্দ।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments