স্বপ্ন

ঠাণ্ডাটা আজ একটু বেশিই পড়িয়াছে, বাহিরেও কনকনে বাতাস, বেড়ার ফাঁক দিয়া সে বাতাস আসিয়া সকলের গায়ে লাগে। একপাশে একটি কুপি জ্বলিতেছে—প্রচুর ধোঁয়ায় মেশানো, লাল শিখা। বাতাসে কড়া তামাকের গন্ধ। রাত এখন কয়টা হইয়াছে কেহ বলিতে পারে না। মাঝে মাঝে কেবল কুকুরের ডাক ছাড়া গভীর নিস্তব্ধতা চারিদিকে।

কলকেটি উপুড় করিয়া আর এক ছিলিম তামাকের আয়োজন করিতে গিয়া কানাই দেখিল, কৌটাতে তামাক নাই। হাতের কাছেই ভেজানো দরজার দিকে চাহিয়া বলিল, ‘একটু তামাক দে তো রে, দামি?’

দামিনী কানাইর মেয়ে। কেবলমাত্র বাবার মুখের অদ্ভুত গল্পটার আকর্ষণেই এতরাত অবধি জাগিয়াছিল। বলিল, ‘তামাক তো নেই বাবা।’

—‘সে কী, কালই না অতগুলো পাতা কাটলাম?’ খাওয়ার মালিক যদিও কানাই একাই, তবু সে আশ্চর্য না হইয়া পারিল না। সঙ্গে সঙ্গে আরও সকলেও। ভয়েরও তাদের সীমা নাই; আহা অমন গল্পটি মাটি হইয়া যাইবে।

কিন্তু দামিনী রক্ষা করিয়াছে। কোথা হইতে খুঁজিয়া পাতিয়া এক ছিলিমের উপযোগী তামাক আনিয়া বাবার হাতে ফেলিল। মেয়েটার বুদ্ধি আছে!

বিষয়টা আগে কী বলা যায় না, বর্তমানে স্বপ্নতত্ত্বে পরিণত।

অবশেষে হুঁকাটি বৃদ্ধ আদিনাথের হাতে বাড়াইয়া দিয়া কানাই বলিল, ‘ওরকম স্বপ্ন কখন দেখে বলো দিকি মামা? সব কিছুই ফলবে কেন? হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান? আমরা যে বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষ ধরে চাষ করে আসছি, সব সময়েই কি ভালো ফসল পাচ্ছি? তেমনি, যা দেখব তাই ফলতে হবে, ওরকম যে বলে, সে একটা আস্ত বোকা ছাড়া আর কী, তোমরাই বলো। আরে বাপু, এ যে আমার আর তোমার মুখের বানানো কথা নয়, এমন-এমন বই আছে যে গো! তাতে ফলাফল লেখা আছে স্পষ্ট। যা লিখেছে সব সত্যি, কিছু মিথ্যে হবার নয়, এতটুকু মিথ্যে হবার নয়।’

নিমীলিত-চক্ষু আদিনাথ সায় দিল—‘দূর? মিথ্যে কেন হবে? যা লিখেছে সব সত্যি। তাহলে আমি একটা বলি শোনো। সেবার—’ মনে মনে সকলে শঙ্কিত হইয়া উঠিল: ‘তোমারটা এখন থাক মামা, পরে শোনা যাবে। কানাইদা, তারপর কি হল?’

আদিনাথ বলিল, ‘দূর!’

চারিদিকে চোখ বড়ো করিয়া চাহিয়া কানাই বলিল, ‘তারপর লোকটা নদীর পারে এসে দাঁড়াল, হুঁ, এখন পার হবে কী করে? মহা মুশকিল! অথচ সেখানে বসে থাকলেও চলবে না, পার হতে হবে! কী আর করা, বসে রইল। সময় যায়—’ সময়ান্তরে কানাইর একটা অভ্যাস, দু-মিনিট বলিয়া চার মিনিট বিশ্রাম করা—এমনভাবে সে কথাটি বলিয়াছে, সকলে সমন্বরে বলিয়া উঠিল, ‘নৌকো!’

—হ্যাঁ। লোকটা চেঁচিয়ে বললে, ও মাঝি, আমায় পার করে দেবে? মাঝি বললে, পারব না। দাও না একটু? না না, আমাদের অনেক কাজ, নলহাটির হাটে ভোরবেলাতক্ না পৌঁছুলে চলবে না। দাও না গো। এই ভর সন্ধেয় ঠেকেছি বলেই না! পয়সা দেবে? হুঁ, মাঝি বললে কিনা পয়সা দেবে? তাছাড়া আর উপায় কী? সে বললে, দেব। তখন তো পারে ভিড়ল এসে। আর—‘উপসংহার করিবার মতো অত্যন্ত নিচু স্বরে কানাই বলিল, ‘আর লোকটা গিয়ে উঠল সেই নৌকোয়।’

সব চুপচাপ! কেউ একটি কথা বলিতেছে না। সকলেই তাহার মুখের দিকে হাঁ করিয়া তাকাইয়া রহিল। বুঝি কানাইর এই বিরতি আর সহিতে না পারিয়াই একজন বলিয়া উঠিল, ‘তারপর?’ কানাইর মুখে এবার হাসি—বাঁ দিকের চোখটি ছোটো হইয়া আসিয়াছে, বাঁ দিকের গালে রেখা আঁকিয়া গিয়াছে। সকলে জানে এ ধরনের হাসি তাহার খারাপ। সেই উপসংহারের কথা কানাই কখন বলিবে কে জানে। হুঁকাটা আর একজনের হাতে দিয়া বৃদ্ধ আদিনাথ বলিল, ‘দূর!’

কিছুক্ষণ পরে কানাইর নীরব হাসি থামিয়াছে। সুতরাং আশা করা যায়, এবার কিছু সে বলিবে। আর বলিল ঠিকই—‘তারপর, বুঝলে মামা, ঠিক এমন সময় স্বপ্নটা গেল ভেঙে আর তার

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice