প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে।
বিকালের রোদের নীচে সরু আলোর পথ দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে প্রশান্ত ভাবিল, দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে আবার এই প্রথম সে গ্রামের দিকে পথ চলিতেছে। সেই পরিচিত পথ। সেই বুনোফুল-ঘাস-লতাপাতার গন্ধ, শুকনো পাতার স্তূপে কোনো অদৃশ্য প্রাণীর খস খস শব্দ, হঠাৎ কখনও সারি সারি আকাশ-ছোঁয়া তালগাছের সামঞ্জস্যহীন অবস্থিতি, সেই খেয়াঘাটের নৌকা ও মাঝি। বছরের পর বছর, মুহূর্তের পর মুহূর্ত কত পরিবর্তন চলিতেছে, কত স্বেচ্ছাচারীর চোখে-মুখে উল্লাস, কত ডাকাত পরের অন্নে মাথা ঠোকাঠুকি করে, অথচ এখানে তার ছোঁয়াটুকু নাই। পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে, তাহাদের চোখ-মুখ ফুলিয়া গেল। আকাশে কী একটা পাখি চমৎকার ডাকিয়া গেল। কিন্তু সেদিকে চাহিতে প্রশান্তর ভয় হয়। যে আকাশের দিকে চাহিয়া উহারা কপালে হাত ঠুকিয়াছে, সেই আকাশের দিকে প্রশান্ত তাকাইতে পারে না।
পথের একপাশে পাটখেতের ভিতর বসিয়া কয়েকটা লোক নিঃশব্দে খেত নিড়াইতেছে। হঠাৎ কখনও কোনো শহুরে চেহারার লোক দেখিলে পঁচিশ বছর বা তারও আগে তাহারা যেভাবে তাকাইত, আজও সেইভাবে তাকায়।
চোখ ছোটো করিয়া একজন বলিল, ‘বাড়ি?’
—‘বাড়ি!’ প্রশান্ত মনে মনে একবার হাসিল। বাড়ি তাহার কোথায়! ভারতবর্ষের কোন্ গ্রামে বা শহরে বাড়ি?
পৌঁছিতে প্রায় সন্ধ্যা হইয়া গেল। প্রশান্ত দেখিল, একটা ঘর প্রায় ধসিয়াই গিয়াছে, আর-একটা ঘরের চাল নাই, কেবল কয়েকটি খুঁটি—একটা বটগাছ ঘরের উপর দিয়া একেবারে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে, উঠান-ভিটি সমস্ত জঙ্গলে ভরা।
এই বাড়ি? এই বাড়ির ঠিকানাই প্রশান্ত পথের পাশের লোকদের বলিয়াও বলে নাই। পঁচিশ বছরের দীর্ঘ অজ্ঞাতবাসে সে বাঁচিয়া আছে বটে কিন্তু তাহার ছোটোবেলার ক্রীড়াভূমি আত্মহত্যা করিয়াছে। কৈশোরে এই প্রাঙ্গণ হইতেই সে তাড়িত, কী একটা কারণে সংসারে একটা ভীষণ অনর্থ সৃষ্টি করায় শান্তিপ্রিয় বাবার চক্ষুশূল হওয়া, আর আজ এতকাল পরে তাহাকে আমন্ত্রণ করিতে একটি প্রাণীও নাই। প্রশান্ত ভাবিল, এখনও কেউ তাহার দিকে সন্দেহের চোখে চাহিতেছে না কেন? লোকগুলি কি রাতারাতি মানুষ হইয়াই গেল? ঝাপসা আলোয় দুই-একজন যদি-বা তীক্ষè দৃষ্টিতে তাহার দিকে তাকাইয়াছে, প্রশান্ত তাহাদের কষ্ট করিয়াও চিনিতে পারে নাই। নিশ্চয় তাহারাও তাহাকে চেনে না।
কয়েকটা চামচিকা ঝটপট তাহার মাথার উপর দিয়া উড়িয়া গেল। আশেপাশে নানারকম কীট-পতঙ্গের অবিশ্রান্ত চেঁচামেচি শোনা যায়, বন্য লতা-পাতার একটা অদ্ভুত গন্ধও নাকে আসে।
বাঁ দিকের একটা রাস্তা হইতে, প্রশান্ত যে পথে চলিতেছিল, সেই পথে পড়িয়া কে একটা লোক নিজের মনে গান গাহিতে গাহিতে সামনের দিকে চলিতেছে। তাহার পরনে লুঙ্গি, কাঁধে একখান গামছাই হইবে, হাতে একটা নিড়ানি।
প্রশান্ত একেবারে সামনেই গিয়া পড়িল, বলিল, ‘কালু মিঞা না?’
লোকটা থামিল, গানও থামিল, ভ্রু কুঁচকাইয়া তাহার দিকে তাকাইল।
সে যে কালু মিঞা ছাড়া আর কেহই নয়, ইহাতে নিশ্চিত হইয়া প্রশান্ত একবার হাসিল।—‘চিনতে পারলে না?’
কালুর চোখের দৃষ্টি এবার সহজ হইয়া আসিল, ঠোঁটের দুই পাশে আস্তে আস্তে হাসি ছড়াইয়া পড়িল, তাহার দিকে একবার হাত বাড়াইয়া আবার কী মনে করিয়া আস্তে গুটাইয়া তাড়াতাড়ি বলিল: ‘বন্ধু না?’
হাত ধরিতে তাহার সংকোচ দেখিয়া প্রশান্ত নিজেই হাত বাড়াইয়া দিল, হাসিয়া বলিল, ‘হ্যাঁ।’
কালু আবার বলিল, ‘বন্ধু-মশয় না?’
—‘হ্যাঁ, কালু।’
বিস্ময়ে আর আনন্দে এবার তাহার হাত জড়াইয়া কালু বলিল; ‘এতকাল কই আছিলা গো, বন্ধু-মশয়? সেই কোন্ কালে গেলা, আর এতদিন বাদে ফিরা আইলা, একটা-দুইটা দিন নাকি? আহারে, এ যে বুড়াও বইনা গেছ দেখছি!’
—‘আর তুমি খুব জোয়ান, না?’
—‘আমরা গেরামে থাকি, রৈদে বিষ্টিতে ভিজে খাটি-পিটি, আমাগোর কথা ছাড়ান দাও—’
প্রশান্ত চারিদিকে একবার চাহিল। এ গাঁয়ের নবীন বা প্রাচীন আর কেউ হঠাৎ এ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments