সাদা কফিন
এতক্ষণ নীরব নিস্তব্ধ ছিল সমগ্র শহর। রাস্তায় রাস্তায় প্রতিরোধ তৈরী করা হয়েছে বলে গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ। খুব কচিৎ একটা সাইকেল-রিক্সা ঝড়ের বেগে ছুটে হয়তো বেরিয়ে গেল, শুধু বাতাস কাটা আর পীচের সঙ্গে চাকা ঘর্ষণের শব্দ, হয়তো রিক্সায় কিছু মালপত্র বোঝাই আছে কিংবা খালি, অথচ কখনো একটা গাড়ির দেখা নেই। মাইল, আধ-মাইল দূরে দূরে ইট, ড্রাম, ওল্টানো গাড়ি ইত্যাদি হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তাতেই রাস্তায় প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। ছায়া ছায়া রাস্তা, বড়ো বড়ো মেহগিনি ও শিশু গাছ রাস্তাগুলোকে আরো নির্জন ও নিবিড় করে তুলেছে। জনমানবের গন্ধ নেই রাস্তায়। মনে হঠাৎ এমনও অবান্তর প্রশ্ন জাগে, অবরোধ টিকবে তো? দূর থেকে সেই অবরোধ পাহারা দিচ্ছে মুক্তিবাহিনী। বারুদের মুখে আগুন লাগল বলে। পরিবেশটা তেমনি বিস্ফোরণমুখী।
জাতীয় সঙ্গীত না বাজিয়ে বেতারের তৃতীয় অধিবেশন বন্ধ হয়ে গেছে।
আমি ভয়ার্ত মনে হন্যে হয়ে একটা রিক্সার কথা ভাবছি। গাড়ি তো পাওয়ার সুযোগ নেই, বাধা ডিঙিয়ে তবু কোনোমতে রিক্সাকে টেনে নিয়ে যাওয়া যাবে। —আমাকে অনেক দূরে, মতিঝিল পেরিয়ে বাসাবো অব্দি যেতে হবে। অদ্দূর হেঁটে যাওয়া, কিংবা হেঁটে যেতে ভয় করছে।
লোকগুলো সব মরে গেল না কি এক নিমেষে।
আমি অনবরত চিন্তা করছি হেঁটে যাওয়া যাবে কিনা। বন্ধু-বান্ধব সবাই আজ গেল কোথায়? প্রেস-ক্লাব কি বন্ধ? সেখানে যাবো কি না আবার দ্রুত ভেবে নিলাম। কয়েক মিনিট। কিন্তু যেন কয়েক লক্ষ সেকেণ্ড ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত। এই ভাবে যেন অনন্ত সময়ের হনন চলল; রাস্তার নিস্তব্ধতায়, ফুটো ফুটো আকাশে, নিরিবিলি এবং নীরব পত্রগুচ্ছে, রাস্তার অন্ধকার লাইটপোস্টে, গির্জার চূড়ার ক্রুশে, রাত্রিপাত হচ্ছে প্রবল বেগে; রাত্রিপাত হচ্ছে নিষ্ঠুর এবং চতুর শত্রুর মত নিরবচ্ছিন্ন এক যোগসাজসে। গত দুদিন কাজের চাপে বাসামুখো হতে পারি নি আমি, অফিসে রাত কাটিয়েছি, আজ একটা কিছু ঘটতে চলেছে এরকম ইঙ্গিত বেতার অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে আছে। এখন সেই নানান চিন্তার পর্বত-প্রমাণ এক বোঝা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসামুখো চলছি, সারি সারি ইমারত ফেলে, বন্ধ রেস্তোরাঁ, হ্যাপি মটরিং ছবি, বাসে ওঠার কিউ—হাই কোর্ট ভবনকে মনে হচ্ছে রূপকথার হাজার-দুয়ারী রহস্যময় প্রাসাদ।
সহসা একটা সাইকেল-রিক্সা দ্রুতবেগে আমাকে কেটে চলে যাচ্ছে দেখে আমি চীৎকার করে তার পেছনে ধাওয়া করলাম। সে আরো বেগে, আরো দ্রুত ছুটল। কিন্তু আমায় যে তাকে ধরতেই হবে! এভাবে আমাকে পাগলের মত ছুটতে দেখে সে কি ভেবে—হয়তো কিছু না ভেবেই—থামল। খবর: শহরে সৈন্য নেমেছে সাব, সরে পড়ুন, এক্ষুণি এদিকে এসে পড়বে। তাদের আছে কামান, বন্দুক, ট্যাঙ্ক, আরো কত কি…
: বল কি? সৈন্য নেমেছে? কোথায়? কতদূরে? —আমার মাথা গুলিয়ে গেল, এ কি হল, এ যে আমি ভাবতে—তুমি কোন্দিকে যাবে ভাই, জল্দি আমাকে নিয়ে চল!
: পারব না সাব। আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে, পথে পথে বাধা, আপনাকে নিয়ে যাব কী করে। না, আমি নিতে পারব না—হাঁপাতে হাঁপাতে রিক্সাঅলা কথাগুলো বলে ফেলল।
বললাম: তুমি যেখানে যাও আমাকে নিয়ে চল, তোমার সঙ্গেই থাকব আমি। বাধা ডিঙিয়ে দুজনে রিক্সা টেনে নেব। —তোপখানা সড়ক, মতিঝিল, কমলাপুর ছাড়িয়ে বাসাবো...
এত সব কথা সংক্ষিপ্ততম সময়েই শেষ হয়েছে। রিক্সাঅলা আমাকে নাছোড়বান্দা দেখে কিংবা করুণাবশতই হোক, তুলে নিল; তখন আশ্চর্য তেজোদীপ্ত সেই অচেনা রিক্সাঅলার গামছাবাঁধা মাথাটি আমার সামনে এক দৃপ্ত বিজয়ীর মতো উন্নত এবং উদ্যত। কিন্তু কদ্দুর গিয়েই বাধা। আর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে গাড়ির ঘর্ঘর শব্দ রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিল। তক্ষুণি সে রিক্সা ফেলে দৌড় দিল, আমার সঙ্গে একটা কথা বলা কিংবা একবার ফিরেও তাকাল না। নিশ্চল রিক্সা, অপসৃত রিক্সাঅলা,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments