মুনাফার হার ও সঙ্কট
পুঁজির দুইটা ভাগ; একটী অপরিবর্ত্তমান অংশ, অপরটী পরিবর্ত্তমান অংশ। প্রথমটীর দ্বারা উৎপাদনের উপকরণাদি ক্রয় করা হয়; দ্বিতীয়টীর দ্বারা শ্রমশক্তি ক্রয় করা হয়। এই দুই অংশের পরস্পর অনুপাত দ্বারা পুঁজির গড়ন নির্দ্ধারিত হইয়া থাকে। মার্কস্ ইহার আখ্যা দিয়াছেন ‘অর্গেনিক কম্পোজিশন’। পৃথক পৃথক শিল্পগুলির পৃথক পৃথক ‘অর্গেনিক কম্পোজিশন’ থাকিতে পারে। কিন্তু যে-কোন শিল্পে—উহার অর্ন্তভুক্ত পৃথক পৃথক কারখানাগুলির অর্গেনিক কম্পোজিশনের তারতম্য সত্ত্বেও-একটা গড়পড়তা অর্গেনিক কম্পোজিশন থাকে। বিভিন্ন শিল্পগুলির অর্গেনিক কম্পোজিশনের একটী গড় বাহির করিয়া আমরা সমাজের মোট পুঁজিরও একটা গড়পড়তা অর্গেনিক কম্পোজিশন নির্দ্ধারণ করিতে পারি।
পুঁজির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুঁজির পরিবর্ত্তমান অংশ বাড়িতে থাকে। প্রতিবারেই উদ্বৃত্ত মূল্য অতিরিক্ত পুঁজিরূপে খাটে; উহার একটি অংশদ্বারা প্রতিবারই শ্রমশক্তি খরিদ করিতে হয়। পুঁজি ক্রমাগত বাড়িতে থাকিলে একদিকে যেমন বড় বড় পুঁজিপতির সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে তেমনি বেশীসংখ্যক লোক শ্রমিক-জীবন যাপন করিতে বাধ্য হয়। পুঁজি বাড়িলে, শ্রমবিভাগ সুক্ষ্মতর হয়, যন্ত্রপাতিও উন্নত হয়। ফলে শ্রমের উৎপাদনশক্তি বৃদ্ধি পায়। উৎপাদনের উপকরণ, অর্থাৎ পুঁজির অপরিবর্ত্তমান অংশ বাড়াইলে সঙ্গে সঙ্গে পুঁজির অপর অংশ অর্থাৎ পরিবর্ত্তমান পুঁজির পরিমাণ হ্রাস পাইবে। পূর্ব্বে হয়ত পুঁজির পঞ্চাশ ভাগ খরচ হইত উৎপাদনের উপকরণাদির জন্য, বাকী পঞ্চাশ ভাগ শ্রমশক্তি খরিদের জন্য। এখন প্রথমটীর জন্য খরচ হইবে আশি ভাগ। আর দ্বিতীয়টীর জন্য খরচ হইবে বাকী কুড়ি ভাগ। যদিও পুঁজির পরিবর্ত্তমান অংশের হারের আপেক্ষিক হ্রাস হইয়াছে, তথাপি পরিমাণের দিক হইতে উহা পূর্বের তুলনায় বেশী হইতে পারে। মোট পুঁজি যদি ১০০ পাউণ্ড হয়, তবে প্রথম হিসাবে শ্রমশক্তির জন্য খরচ হইয়াছে ৫০ পাউণ্ড। এখন পুঁজি ৫০০ পাউণ্ড: পরিবর্ত্তমান অংশ যদি হয় কুড়ি ভাগ তবে শ্রমশক্তি ক্রয়ের জন্য খরচ হইবে ১০০ পাউণ্ড। অতএব আমরা দেখিতেছি, পরিবর্ত্তমান পুঁজির হারের হ্রাস হইয়াছে বটে, কিন্তু উহার মোট পরিমাণ বাড়িয়াছে।
পূর্বেই আমরা দেখিয়াছি, উদ্বৃত্ত মূল্য ও পরিবর্ত্তমান পুঁজির অনুপাতকে বলা হয় উদ্বৃত্ত মূল্যের হার। পুঁজিপতি সাধারণত মোট পুঁজির সহিত উদ্বৃত্ত মূল্যের অনুপাত করে। এই অনুপাতকে বলা হয় মুনাফার হার। প্রথমটীতে মোট পুঁজির একটী অংশের সঙ্গে উদ্বৃত্ত মূল্যের অনুপাত করা হইয়াছে, দ্বিতীয়টীতে মোট পুঁজির সঙ্গেই উদ্বৃত্ত মূল্যের অনুপাত করা হইয়াছে। অতএব সংখ্যাত্মক দিক হইতে উদ্বৃত্ত মূল্যের হার এবং মুনাফার হার এক নয়; কিন্তু উদ্বৃত্ত মূল্য এবং মুনাফা একই।
উদ্বৃত্ত মূল্য অথবা মুনাফার পরিমাণ নির্ভর করে শ্রমদিবসের দৈর্ঘ্য, শ্রমের গাঢ়তা এবং মজুরীর উপর। মজুরী বাড়িলে উদ্বৃত্ত মূল্য কমে; কিন্তু শ্রমদিবসের দৈর্ঘ্য এবং শ্রমের গাঢ়তা বাড়িলে উদ্বৃত্ত মূল্য অথবা মুনাফাও বাড়ে। অন্যদিকে মজুরী কমিলে উদ্বৃত্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়। মুনাফা বৃদ্ধির আরো একটী কারণ আছে। ইহাকে বলা হয় ‘টার্ন ওভার’। উৎপাদিত দ্রব্য বাজারে বিক্রয় করিয়া তাহা মুদ্রায় পরিবর্ত্তিত করা হয়। এই মুদ্রাই আবার পুঁজিরূপে প্রত্যাবর্ত্তন করে। পুঁজির প্রত্যাবর্ত্তনের নামই ‘টার্নওভার’। প্রত্যাবর্ত্তনের সময় কম হইলে, একই পুঁজি বেশীবার খাটিতে পারে, একটী পুঁজি হয়ত বছরে তিনবার খাটে; একই পরিমাণের অপর একটী পুঁজি চার বার খাটে। অতএব দ্বিতীয়টীতে উদ্বৃত্ত মূল্য লাভ হইবে অধিক।
‘টার্নওভার’ বেশী হইলে কি ভাবে মুনাফা বৃদ্ধি হয়, নীচের দৃষ্টান্তটী হইতে তাহা পরিষ্কার হইবে। মোট পুঁজি ধরা যাউক ১০; অপরিবর্ত্তমান পুঁজি ৮০; পরিবর্ত্তমান পুঁজি ২০; উদ্বৃত্ত মূল্যের হার ১০০%। প্রতি বছরে এই পুঁজি প্রত্যাবৃত হয় দুইবার অর্থাৎ ‘টার্ন ওভার’ দুই। উদ্বৃত্ত মূল্যের হার ১০০%। সুতরাং প্রতিবারের উৎপাদনে উদ্বৃত্ত মূল্যের পরিমাণ ২০; এবং প্রতিবারে যে-মোট মূল্য উৎপাদিত হয় তাহার পরিমাণ ৮০+২০+২০=১২০। দুইবারে মোট উৎপাদিত মূল্যের পরিমাণ ১৬০+৪০+৪ =২৪০। এই ক্ষেত্রে মুনাফার হার নির্ধারণ করিতে গিয়া আমরা ২০০’র সঙ্গে ৪০-এর অনুপাত করিব না; অনুপাত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments