আসমানি স্তেপভূমি
বৃদ্ধ জাখার আর আমি ডন নদীর ধারে একটা বুনো কাঁটাঝোপের তলায়, রৌদ্রদগ্ধ ন্যাড়া একটা ঢিবির ওপর শুয়েছিলাম। বাদামী রঙের একটা চিল একটা মেঘের আঁশালো ধারির নিচে ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছিল। পাখিদের পুরীষ লাঞ্ছিত কাঁটাঝোপের পাতাগুলো আমাদের কোনো ছায়াই দিচ্ছিল না। গুমোট গরমে কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করছিল; ডন নদীর পাকানো পাকানো ফুটকি কাটা জলের কিংবা পায়ের নিচের খাঁজকাটা তরমুজের খোলাগুলোর দিকে তাকালে, মুখের মধ্যে চটচটে একটা লালা এসে যাচ্ছিল কিন্তু মুখ থেকে সেটা ফেলে দিতেও আলসেমি লাগছিল।
নিচেয় খোদলের মধ্যে শুকিয়ে আসা পুকুরের কাছে ভেড়াগুলো গাদাগাদি করে একটা দঙ্গল পাকিয়ে একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল। জগতের কাছে ক্লান্ত ভাবে তাদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তারা তাদের ধূলো মাখা লেজগুলো নাড়ছিল আর ধুলোর তাড়নে ক্লিষ্টভাবে হাঁচছিল। বাঁধের ধারে একটা নধরকান্তি ভেড়ার ছানা মাটিতে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে এক ধুলোয় মলিন হলুদ রঙের ভেড়ির দুধ খাচ্ছিল। মাঝে মাঝে সে তার মাথা দিয়ে তার মার বাঁটের মধ্যে সজোরে ঠেলা মারছিল। ভেড়িটা আর্তনাদ করে তার পিঠটা বাঁকিয়ে দিচ্ছিল, দুধটা যাতে ভালো করে বয়ে যায়। আমার মনে হলো ভেড়ির চোখে যেন যন্ত্রণার আভাস।
বৃদ্ধ জাখার আমার দিকে পাশ করে বসেছিল। পশমের বোনা শার্টটা খুলে ফেলে দিয়ে প্রায় অন্ধের মতো চোখদুটো কুঁচকে শার্টের খাঁজ আর সেলাইয়ের কাছে কি যেন খুঁজছিল। সত্তর বছর পুরতে তার এখনো বারো মাস বাকি। তার অনাবৃত পিঠটা নানা জটিল রেখায় কুঞ্চিত, তাঁর কাঁধের তির্যক হাড়গুলো চামড়ার মধ্যে দিয়ে ঠেলে বার হয়ে আসছে; কিন্তু চোখদুটো তার নীল, যৌবনদীপ্ত, সাদা ভ্রুর-নিচে দৃষ্টি সতর্ক, তীক্ষ্ণ।
তার কম্পিত, গ্রন্থিল আঙুলগুলো দিয়ে যে উকুনটা সে ধরেছিল, সেটা সে ধরেই রেখেছিল সন্তর্পণে, আলতো ভাবে, তারপর নিজের কাছ থেকে যথাসম্ভব দূরে মাটিতে সেটাকে নামিয়ে রেখে শূন্যে একটা ক্রুশ চিহ্ন এঁকে বিড়বিড় করে বললো:
“উকুন, তুমি গুটিগুটি সরে পড়ো। তুমি তো প্রাণে বাঁচতে চাও, তাই না? সেই তো হলো কথা…। তবে অনেক রক্ত শুষেছো তুমি…বেটা জমিদার কোথাকার...।”
ফোঁৎ করে একটা শব্দ করে শার্টটা গায়ে গলিয়ে নিয়ে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে তার কাঠের মগের ঈষদুষ্ণ জলে দীর্ঘ একটা চুমুক দিলো। প্রতিটি ঢোক গেলার সময় তার কণ্ঠ মণি ওঠানামা করছিল; তার চিবুক থেকে গলা পর্যন্ত সিক্ত চামড়ার দুটো ভাঁজ ঝুলছিল, জলের ফোঁটা তার দাড়ির ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো, তার হলুদ রঙের চোখের পাতা ভেদ করে সূর্য রক্তিমভাবে জ্বলতে লাগলো।
জগের মুখ বন্ধ করে, সে আড়চোখে আমার দিকে তাকালো, আমার চোখে চোখ পড়তে, শুষ্কভাবে তার ঠোঁট কামড়াতে লাগলো আর দূরে স্তেপভূমির দিকে তাকিয়ে রইলো। খোঁদলের ওধারে ধোঁয়াটে ভাবে একটা কুয়াশা উঠছিল, রৌদ্রদগ্ধ মাটির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসে থাইমগুল্মের মিষ্টি গন্ধ। দু’এক মিনিট বাদে বৃদ্ধ তার রাখালের বাঁকানো লাঠি তার তামাকের রসে রঞ্জিত আঙুল দিয়ে আমার ওপাশে সরিয়ে রাখলো।
“খাদের ওপাশে পপলার গাছগুলোর মাথা দেখতে পাচ্ছো কি? ওটাই হলো টোমালিন বংশের জমিদারি, পপলারোভকা। আর পপলারোভকার কৃষকদের বসতি হলো ওরই কাছে; বিগত দিনে ওরা ছিল ভূমিদাস। আমার বাবা তাঁর সারাটা জীবন ছিল ঐ ভদ্রলোকটির কোচম্যান। আমাকে তার অভাগা ছেলেকে সে বলতো কেমন করে মি. ইয়েভগ্রাফ টোমিলিন প্রতিবেশী এক ভূস্বামীর কাছ থেকে পোষা একটা সারসের বিনিময়ে তাকে এনেছিল। আমার বাবার মৃত্যুর পর তার জায়গায় আমিই কোচম্যান নিযুক্ত হয়েছিলাম। ভদ্রলোকটির নিজের তখন বয়স প্রায় ষাটের কাছে। বেশ পুরুষ্ট চেহারা, বনেদী রক্ত বইছে নাড়িতে। তার যৌবনে সে জারের রক্ষী বাহিনীতে ছিল। কিন্তু তার কার্যকাল শেষ হলে সে ডন নদীর ধারে তার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments