বীরপ্রতীক ওদারল্যান্ড ও টম বাটা
লেখক: মুহম্মদ সবুর
টমাস জন বাটা জানতেন যুদ্ধংদেহী পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে থাকা পূর্ব পাকিস্তানে তাদের প্রতিষ্ঠানটি জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে কঠিন অবস্থান নিয়েছে ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটি এবং এর প্রধান কর্মকর্তা। সে এক বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান। পাকিস্তান সরকার বা সেনাবাহিনী ঘুণাক্ষরে টের পেলে অবস্থা হবে ভয়াবহ। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবন রক্ষাই হয়ে পড়বে কঠিন, প্রতিষ্ঠানও হবে বেহাত। কিন্তু পিছু হটে যাওয়ার কোনো জো নেই। নীতিগত কারণে এই অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসা সম্ভবও ছিল না আর। বিজয় অর্জন পর্যন্ত অত্যন্ত গোপনে কাজ চালাতে হয়েছে। তবে সদাসতর্ক থাকার জন্য ঢাকা অফিসকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই '৭১ সালে। বিশ্ব মানচিত্রের ভূখণ্ডে একটি দেশজুড়ে তখন দখলদার বাহিনী চালিয়ে যাচ্ছিল নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ। কোটি মানুষকে বাধ্য করেছে দেশত্যাগে। বিষয়টি পীড়িত ও মর্মাহত করেছে তাকে। তবে এ রকম ঝুঁকি তার কাছে নতুন নয়। ঘড়বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানা ফেলে জন্মভূমি ছেড়ে ভিনদেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে। পেছনে ছিল কারাদণ্ডের আদেশ; এমনকি মৃত্যুও। তাই '৭১-এ বাংলদেশের করুণ অবস্থার কাহিনী শুনেই বুঝতে পারেন, কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। চোখের সামনে তার ভেসে উঠেছিল নাৎসি বাহিনী, জার্মান আগ্রাসন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বীভৎসতা; বাধ্যতামূলক দেশত্যাগের করুণ দৃশ্যপট। তাই যখন জানলেন, মুক্তিবাহিনীর জন্য জুতা প্রয়োজন, ঢাকা অফিস সরবরাহ করতে সক্ষম, টমাস বাটা আপত্তি জানাননি। ঢাকা অফিস থেকে সুদূর কানাডায় তার কাছে পাঠানো আলোকচিত্র দেখে শিউরে উঠেছিলেন। বীভৎসতা ও নির্মমতা তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল বৈকি। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চেয়েছিলেন; কিন্তু কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেননি। দখলদার পাকবাহিনীর কঠিন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, রসদপত্র জোগানোর মতো কঠিন দুঃসাধ্য কাজটি করেছিল বাটা সু কোম্পানি। ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির যিনি প্রধান ছিলেন, নিজেই স্বউদ্যোগে মক্তিযুদ্ধের পক্ষে নেমে পড়েন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নারকীয় বীভৎসতার শিকার এই কর্মকর্তাটি সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া ছাড়াও সে সময় গুপ্তচরবৃত্তিতে নিয়োজিত ছিলেন। নাৎসি বাহিনীর আগ্রাসনে তাকেও জন্মভূমি হল্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নিতে হয়। চোখের সামনে পাকবাহিনীর নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন দেখে সহ্য করতে পারেননি বাটা সু কোম্পানি লিমিটেডের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডব্লিউএএস ওদারল্যান্ড। পরবর্তী সময় বাংলাদেশ সরকার বীরপ্রতীক খেতাবে তাকে ভূষিত করে। মুক্তিযুদ্ধে একজন বিদেশীর এ ত্যাগী ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।
১৯৭১ সালে বাঙলাদেশের পক্ষে সব প্রতিকূলতা, ঝুঁকি এড়িয়ে যে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিল, সেই বাটা সু কোম্পানির প্রধান টমাস জে বাটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সম্মান জানাতে কানাডার টরন্টোতে 'বাটা সু মিউজিয়ামে' বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারের জন্য বাটা নির্মিত দু'জোড়া জুতাও রেখেছেন। টমাস বাটার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯৯৮ সালে। তারপর ২০০২ সাল পর্যন্ত কয়েক দফা দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। বাটা কারখানা ও জাদুঘরও পরিদর্শন করা হয়েছে। কানাডায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে অর্ধযুগ বাণিজ্যদূতের দায়িত্ব পালনকালে খুব কাছ থেকে দেখেছি; জেনেছি কী কঠিন দুঃসহ জীবন পাড়ি দিয়ে বিশ্বজুড়ে বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, রসদ সাহায্য-সহায়তা দিলেও ভিয়েতনামে বাটার ভূমিকা সম্পর্কে ব্যাখ্যাটা ভিন্ন। ভিয়েতনামি যোদ্ধাদের জন্য সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি সেখানকার প্রেক্ষাপটের কারণেই।
হল্যান্ডের রাজধানী আমষ্টাডামে ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি সাধারণ পরিবারে জন্মেছিলেন ওদারল্যন্ড। তার পিতৃভূমি অস্ট্রেলিয়ায়। প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ পাননি; তাই সতেরো বছর বয়সে জীবিকার জন্য ছোটখাটো চাকরি করেন। পরে যোগ দেন বাটা সু কোম্পানিতে। ওদারল্যান্ড যে মুক্তিযোদ্ধাদের কারখানার ভেতর প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও দিয়েছিলেন টমাস বাটা এটা বেশ পরে জানলেও এ নিয়ে বিন্দুমাত্র ক্ষুব্ধ হননি। বরং এমন ঝুঁকি নেওয়ার পক্ষে নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি। ওদারল্যান্ডকে এ জন্য
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments