গরুড়ের কথা
এক
একবার মহামুনি কশ্যপ পুত্রলাভের জন্য খুব ঘটা করিয়া যজ্ঞ করিতেছিলেন। দেবতা মুনিগণ সকলে মিলিয়া সেই যজ্ঞে কাজ করিতে আসেন।
যজ্ঞের সকল কাজ ইহাদের মধ্যে বাঁটিয়া দেওয়া হইল। যাঁহারা কাঠ আনিবার ভার পাইলেন, ইন্দ্র তাঁহাদের মধ্যে একজন। ইহাদের মধ্যে বালখিল্য নামক একদল মুনিও ছিলেন।
এই বালখিল্যদিগের মতন আশ্চর্য মুনি আর কখনো হইয়াছে কিনা সন্দেহ। দেখিতে ইহারা নিতান্তই ছোট-ছোট ছিলেন। কত ছোট, তাহা আমি ঠিক করিয়া বলিতে পারিব না। কেহ বলিয়াছেন যে তাঁহারা অঙ্গুষ্ঠ-পরিমাণ, অর্থাৎ বুড়ো আঙ্গুলের মতো ছোট্ট ছিলেন। কিন্তু এ কথা যে একবারে ঠিক নয়, তাহার প্রমাণ এই একটা ঘটনাতেই পাওয়া যাইতেছে।
ইহাদের দলে কয়জন ছিলেন জানি না। কিন্তু দেখা যায় যে, কশ্যপমুনির যজ্ঞের জন্য কাঠ কুড়াইতে গিয়া তাঁহারা সকলে মিলিয়া অতি কষ্টে একটি পাতার বোঁটা মাত্র বহিয়া আনিতেছিলেন। তাহাও আবার পথে একটা দুর্ঘটনা হওয়াতে, তাঁহারা যজ্ঞস্থানে পৌঁছাইয়া দিতে পারেন নাই।
দুর্ঘটনাটা একটু ভারী রকমের। গোরুর পায়ের দাগ পড়িয়া পথে ছোট-ছোট গর্ত হইয়াছিল, সেই গর্তগুলিতে বৃষ্টির জল দাঁড়াইয়াছিল। পাতার বোঁটা লইয়া ঠেলাঠেলি করিতে করিতে, বালখিল্য ঠাকুরেরা সেই বোঁটাসুদ্ধ সকলে সেই গর্তের একটার ভিতরে গড়াইয়া পড়িয়াছেন। তারপর আর তাহার ভিতর হইতে উঠিতে পারেন না।
এই সময়ে ইন্দ্র পর্বতপ্রমাণ কাষ্ঠের বোঝা লইয়া সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মুনিদিগের দুর্দশা দেখিয়া তাঁহার বড়ই আশ্চর্য বোধ হইল আর হাসি পাইল। পিপীলিকার মতন মুনিগণকে দেখিয়া, তাঁহার একেবারে গ্রাহ্য বোধ না হওয়াতে, সেই হাসি আর তিনি থামাইতে চেষ্টা করেন নাই। ইহার উপর আবার একটু-আধটু ঠাট্টাও যে না করিয়াছিলেন এমন নহে। শেষে আবার তাহাদিগকে ডিঙাইয়া চলিয়া আসেন।
মুনির সম্মান তো আর শরীরের লম্বা-চওড়া দিয়া হয় না, তাঁহাদিগের সম্মান আর ক্ষমতা তাঁহাদের তপস্যার ভিতরে ভিতরে। বালখিল্যদের মতন তপস্বী খুব কমই ছিল। আর তাঁহাদের ক্ষমতা যে কিরূপ ছিল, তাহার পরিচয়ও তাঁহারা তখনই দিলেন।
ইন্দ্রের ব্যবহারে অত্যন্ত অপমান বোধ করিয়া, তাঁহারা উঁহার চেয়ে অনেক বড় আর-এক ইন্দ্র জন্মাইবার জন্য যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। এ কথা জানিবামাত্রই ইন্দ্রের ভয়ের আর সীমা নাই। তিনি তাড়াতাড়ি কশ্যপের নিকট আসিয়া বলিলেন, ‘বাবা, এখন আপনি না বাঁচাইলে আর উপায় দেখিতেছি না।’
ইন্দ্র কশ্যপের পুত্র। বারোজন আদিত্যের মধ্যে যাঁহার নাম শত্রু, তিনিই ইন্দ্র। সুতরাং পুত্রের জন্য তাঁহার দয়া না হইবে কেন? কশ্যপ ইন্দ্রের সকল কথা শুনিয়া, বালখিল্যদিগের নিকট গিয়া বলিলেন, ‘মুনিগণ, আপনাদের তপস্যা বৃদ্ধি হউক। আমি একটি কাজ করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, আশীর্বাদ করুন যেন আমার কাজটি হয়।’
সত্যবাদী বালখিল্যগণ তখনই বলিলেন, ‘আপনার কার্যসিদ্ধি হইবে।’
তাহা শুনিয়া কশ্যপ তাঁহাদিগকে মিষ্ট কথায় বুঝাইয়া বলিলেন, ‘দেখুন, ব্রহ্মা আমার এই পুত্রটিকে ইন্দ্র করিয়া দিয়াছেন। এখন আপনারা যদি ইহাকে যজ্ঞ করিয়া তাড়াইয়া দেন, তাহা হইলে তো ব্রহ্মার কথা মিথ্যা হইয়া যায়। আপনাদের যজ্ঞ বৃথা হয়, ইহা কখনই আমার ইচ্ছা নহে। আপনারা যে একটি ইন্দ্র করিতে চাহিয়াছেন, তাহা হইবেই। তবে আমি এই চাহি যে সেই ইন্দ্র আমাদিগের ইন্দ্র না হইয়া, পাখির ইন্দ্র হউক। দেখুন, ইন্দ্র মিনতি করিতেছেন। আপনারা তাঁহার উপর সন্তুষ্ট হউন।’
ধার্মিকের রাগ বেশিক্ষণ থাকে না। সুতরাং কশ্যপের কথায় বালখিল্যগণ তখনই আহ্লাদের সহিত ইন্দ্রকে ক্ষমা করিলেন। তারপর তাঁহারা কশ্যপকে বিনয় করিয়া বলিলেন, ‘আমরা দুইটিও জিনিসের জন্য এই যজ্ঞ আরম্ভ করিয়াছিলাম, নূতন একটি ইন্দ্র, আপনার একটি পুত্র। এ অবস্থায় আপনার যাহা ভালো বোধ হয়, তাহা করুন।’
সুতরাং স্থির হইল যে এই নূতন ইন্দ্রটি যেমন পাখির ইন্দ্র হইবে, তেমনি কশ্যপের পুত্রও হইবে। সেই পুত্রই গরুড়, সে পক্ষিগণের ইন্দ্র।
গরুড়ের শরীর অতিশয় প্রকাণ্ড ছিল, আর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments