নরলোকে বানর

খোকন, বাবা দেখ তো, ঘরে হুটোপুটি করছে কারা?

আমি তখন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের গা-শেতল-করা মিসমিদের কবচ-এর পাতায় ডুবে। প্রাচীনদের মনে না পড়েই পারে না-সেই যে বইয়ের গোড়ায় জানাল। গলিয়ে আসা চকচকে ছোরা বাঁধা বাঁশের আঁকশি দুহাতে ধরা গল্পের বিস্মিত নায়কের ছবিখানার কথা। প্রতুল ব্যানার্জির অতুল আঁকা ছবিটা আজও হানা দেয অতীত কাছে এসে দাঁড়ালে। আমি তখন সেই ভয়ংকর মুহূর্তে অদৃশ্য ছোরার সঙ্গে জুঝে চলেছি, এমন সময় রান্নাঘর থেকে মায়ের আদেশ। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখি আলমারির ওপরে যে বড় আয়না, তার সামনে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে ছোটো দুটো বানর লম্ফঝম্ফ করছে কিচিরমিচির শব্দে। আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিপক্ষদের দেখে খামচাখামচি করেও ঘায়েল করতে না পেরে ওদের রাগের মাত্রা বেড়েই চলছিল। প্রথমে আমার উপস্থিতি ওরা টের পায়নি। একটা কিছু করতে যাব, হঠাৎ মনে পড়ে গেল একেবারে শৈশবকালের কথা। তখন আমাদের আবাস কলকাতা। বৌবাজার-সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের মোড়ে তেতলা বাড়ির সবচেয়ে উঁচু তলায় থাকি। বৌবাজার মানে বাইজি-অলংকার-ফার্নিচার-ঘড়িওয়ালাদের পাড়া। তো আমাদের বাসাবাড়ির নিচেই ছিল এক ফার্নিচার তৈরির দোকান। দোকানির ছিল একটা বানর। সে বেচারা বাটালির ঘা দিয়ে কি র‍্যাঁদা চালিয়ে কাজ করত। তার পাশে শেকল বাঁধা বানরটি তা-ই দেখত আর থেকে থেকে কিচিরমিচির করত। আমরা দুভাই ওই বানরে মজে গেলুম। ওর লম্ফঝম্ফ, অবোধ কিচিরমিচির আমাদের আনন্দ জোগাত।

একদিন গোমড়া মুখে বসে থাকতে দেখে অগ্রজ কাছে গিয়ে ওকে খেলাতে গিয়ে উচক্কা বানরের খামচা খেয়ে বসলেন। ছোট হাসপাতাল। চিকিৎসক বললেন, ১৪ দিন তক্কে তক্কে থাকতে হবে। বানরটা মরে কি মরে না! যদি বাঁচে তো ভাইও বাঁচবে। ভাগ্যিস, বানরটা মরেনি।

কাজেই আমি নিথর। কিছুক্ষণ পর আমার উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্র কয়েক লাফে দরজা পেরিয়ে বানর যুগল পগার পার।

কাছে গিয়ে দেখি, তেলের শিশি উল্টে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আলমারি মেঝে তেলে তেলে তেলময়। আর চিরুনি, বোনেদের চুলের কাঁটা-ফিতে কোথায় ছড়িয়ে নেই!

তো আমাদের ওই চল্লিশ-পঞ্চাশের যুগে ঢাকাতে এ ব্যাপারটা ছিল। ছিল বানরের এই উৎপাত।

এখন ঢাকার এই বানর-নাগরিকদের নিয়ে কিছু বলব।

নবাগতের দাপটে ঢাকার বহু তল্লাটকে আজ আর কেউ পুরোনো নামে ডাকে না। এই যেমন বকশী বাজারের কাছে চুহার বাজার নামে যে পল্লিটি ছিল, ভোল পাল্টে তা-ই আজ জয়নাগ রোড। কিন্তু চুহার বাজার কেন? বোধ করি চুহা অর্থাৎ ইঁদুরের উৎপাত বেশি ছিল। নাজির হোসেন তাঁর ছেলেবেলায় সাদা ইঁদুর অর্থাৎ গিনিপিগ বেচাকেনা করতে এবং অনেক বাড়িতে তা পুষতেও দেখেছেন। বোধ করি এ কারণেই জায়গার নামকরণ। সে যা-ই হোক, ১৯২১ সালে মাত্র তিনশত টাকার বিনিময়ে ঢাকা পৌরসভা স্থানীয় প্রতাপশালী নাগরিক জয়চান্দ নাগের সম্মানে এই রাস্তার নামকরণ করেন জয়চান্দ নাগ লেন, যা আজকের জয়নাগ রোড। এই জয়নাগের কাছেই ছিল একটা ছোট্ট এলাকা-বানরটুলি। আমাদের আবাসও ছিল এর ধারেকাছেই-কামিনীভূষণ রুদ্র রোডে। তো বানরটুলি নামটার উৎপত্তি জানা না থাকলেও ঢাকার রেয়াজ অনুযায়ী এ কথা ধরে নেওয়া যায়, নিশ্চয়ই এখানে একসময় বানরদের আস্তানা ছিল। তার মানে এই নয়, ঢাকার এখানেই শুধু বানরদের দেখা মিলত। আমাদের চাচা থাকতেন বংশাল রোডে, 'মানসী' সিনেমা হলের কাছে। সেখানেও ওদের কম দৌরাত্ম্য দেখিনি। এ ছাড়া বনগ্রাম, বানিয়া নগর-মোট কথা যেখানেই গাছপালার আধিক্য, সেখানেই আমি বানর দেখেছি। নাজির হোসেন তাঁর কিংবদন্তীর ঢাকায় বানরদের যে অপূর্ব বিবরণ দিয়েছেন, পাঠকদের কৌতূহল নিবারণের জন্য এখানে তা তুলে ধরছি: "...গাছগাছালি ও বাড়ির ছাদে অসংখ্য বানর চরাফেরা করতো। এমনকি ভোরবেলা শত শত বানর দলবদ্ধভাবে রাস্তার মাঝখানে বসে থাকতো আর মনের সুখে একে অপরের উকুন মারতো।

রাস্তার ওপর

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice