রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ সাহিত্য
সতেরো বছর বয়সে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের “য়ূরোপ-প্রবাসীর পত্র” প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে—বলা হয় সেই থেকে তাঁর ভ্রমণ সাহিত্যের শুরু। লক্ষণীয় কোনো উপন্যাস রচনার আগেই রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এক নাতিদীর্ঘ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়—আরো দুবছর পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালে বেরোয় ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’। কিন্তু যে সরল ও প্রাঞ্জল গদ্য ঐ সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে বেরিয়েছিল, তৎকালীন প্রচলিত গদ্যের মাপে শুধু হয়, আধুনিকতার যে কোনো মাপকাঠিতেই তা উৎকর্ষের একটি অনতিক্রম্য স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ও গদ্য ভাষার যে ফর্মটি দেখা যায় তা “য়ূরোপ প্রবাসীর” গদ্যে প্রচ্ছন্ন, এবং বোধ করি তা থেকে উদ্ভূত। বস্তুত গদ্যশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে হলে তাঁর অসাধারণ ‘গল্পগুচ্ছ’ ও উপন্যাসগুলোর পাশাপাশি ভ্রমণ কাহিনীগুলিও পাঠ করা প্রয়োজন। সহজ সরল কাহিনী বা ঘটনাপ্রবাহ— বর্ণনার প্রয়োজনে হোক বা তত্ত্ববহুল কোনো দার্শনিক আলোচনাকে ধারণ করার জন্যেই হোক, (যার উদাহরণ জাপান যাত্রীতে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত) ভ্রমণ কাহিনীসমূহের গদ্যে যে ঋজুতা, স্থিতিস্থাপকতা ও স্বাধীনতা দেখা যায় তেমনটি “যোগাযোগ”, “গোরা”, এমনকি “দুই বোনে”র মতো চিরসফল উপন্যাসের সর্বত্র চোখে পড়ে না। গদ্য লেখকের স্বাধীনতার সবটুকু আস্বাদ রবীন্দ্রনাথ সেই যৌবনের উন্মেষকালে সর্বতোভাবে নিয়েছিলেন।
শুধু গদ্যের ফর্ম নয়, রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র চরিত্র-লক্ষণসমূহ তাঁর ভ্রমণ কাহিনীর সর্বত্র আছে। ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহতের দর্শন ও তজ্জনিত আনন্দ ও উল্লাস, বিশ্বের বৈপরীত্যময় জীবনপ্রবাহকে সমন্বিত করার দার্শনিক প্রচেষ্টা—যা “গীতাঞ্জলি”র ইংরেজি ভূমিকা লেখক সবিশেষ ডব্লিউ. বি. ইয়েটসকে নাড়া দিয়েছে এবং যার সন্ধানে ইয়েটস নিজেও সর্বজীবনব্যাপী সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন—জীবনের আনন্দ বেদনার বিচিত্র প্রবাহটিকে হৃদয়ে অনুভবের প্রচেষ্টা—সবই দৃষ্ট হয় ভ্রমণ কাহিনীগুলোতে। শুধুই পর্যটক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ নেই কোথাও—আছেন নানারূপে নানান পরিচয়ে—কখনো তিনি প্রকৃতি উপাসক, প্রেমিক, কখনো প্রকৃতির পাঠশালায় পড়ুয়া: কখনো কবি, কখনো দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক কখনো–বা, আবার মাঝে মাঝে সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, সমাজ, রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বিজ্ঞান এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যা—শিক্ষা সম্পর্কে রেখেছেন মূল্যবান মতামত। “রাশিয়ার চিঠি”তে’ রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায় শিক্ষাব্রতী হিসেবে, তাঁর শিক্ষানীতি ও শিক্ষা-দর্শন সম্পর্কে আমাদের ধারণা বস্তুতই অপূর্ণ থাকবে রাশিয়ার চিঠিকে ঘনিষ্ঠভাবে না জানলে। আবার “পারস্যে” রবীন্দ্রনাথ একজন ইতিহাস পাঠক; ইতিহাসের বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহকে বিশ্লেষণ করেছেন, কিছু কিছু গৌরবের ঘটনাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন, আর সর্বত্রই ভারতের ক্লিষ্ট, বেদনাক্রান্ত বর্তমানের সঙ্গে তার তুলনা করেছেন, ব্যথিত হয়েছেন, ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ইরাকে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, এক বেদুইনের তাঁবুতে দিনের আহারের নিমন্ত্রণ ক্লান্ত শরীর নিয়ে রক্ষা করতে চলেছেন, যেহেতু প্রথম যৌবনে একবার সখেদে লিখেছিলেন ‘ইহার চেয়ে হতাম যদি আরব বেদুইন’। কল্পনার সেই চিত্রের সাথে যথেষ্ট মিল খুঁজে পান নি বরং দেখা যায় বেদুইনের তাঁবুতে “গোটাকতক কাঠির উপরে কোনো মতে চামড়া-জড়ানো একটা তেড়াবাঁকা একতারা যন্ত্র বাজিয়ে একজন গান ধরল। তার মধ্যে বেদুইনী তেজ কিছুই ছিল না। অত্যন্ত মিহিচড়া গলায় নিতান্ত কান্নার সুরে গান। একটা বড় জাতের পতঙ্গের রাগিণী বললেই হয়।”[১]কিন্তু এই অসম্ভব স্থানেই আরেকবার মহামানবের মিলনের বাণী ধ্বনিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “বাংলাদেশের নদীবেষ্টিত সন্তান আমি, এদের মাঝখানে বসে খাচ্ছিলুম আর ভাবছিলুম, সম্পূর্ণ আলাদা ছাঁচে তৈরী মানুষ আমরা উভয়ে। তবুও মনুষ্যত্বের গভীরতর বাণীর যে ভাষা সে ভাষায় আমাদের সকলেরই মন সায় দেয়,”।[২]রবীন্দ্রনাথ ভারতকে নতুন আলোকে দেখেছেন ঐ প্রবাসে, “পারস্যে”র সর্বত্র ভারতের সাম্প্রদায়িক অবস্থা তাঁর মনে উদ্বেগ জাগিয়েছে, তাঁকে শঙ্কিত করেছে। হিন্দু মুসলমানের অভিন্ন আস্থা আর পরিচিতিকে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু দেখেছেন তারা দুই যমজ ভাই, পিঠে পিঠে লাগানো, হাঁটতে গেলেই বিরোধ উপস্থিত অথচ আলাদা করা যায় না তাদের। অতঃপর রবীন্দ্রনাথের যে অনুধাবন, যাকে তাঁর ধর্মতত্ত্বের সর্বোৎকৃষ্ট প্রকাশ বলে ধরে নেওয়া যায়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments