-
এক
রবীন্দ্রনাথ কবি, তবে তিনি আর দশজন কবির মতো কেবল কতিপয় দ্যুতিময় কবিতার নির্মাতা ছিলেন না। অর্থাৎ তাঁর কবিত্ব সীমাবদ্ধ থাকে নি কেবল কাব্য-নির্মাণ কলায়; নাট্য-সৃজন সংবেদনায়, গল্প-উপন্যাসের শিল্পিত রূপায়ণে, প্রবন্ধ রচনার প্রগাঢ় প্রজ্ঞায় কিংবা সঙ্গীত—গীতিনাট্যের সাংকেতিক সুর-মূর্ছনায়। তাঁর এ কবি-শক্তি সর্বানুভূমিতে যেমন দীপ্র, সর্বত্রচারিতায় তেমনি ঈর্ষণীয় ক্ষিপ্র। ‘ভূমা’র প্রবল আকর্ষণে তিনি আগ্রহী হয়েছিলেন ‘বিশ্ব পরিচয়ে’, সীমাবদ্ধকালের খণ্ডিত মানুষ তাই তাঁর অন্বিষ্ট ছিল না কদাচ, জীবনের খণ্ডাংশকে প্রতিফলিত করা তাঁর কবি-স্বভাব বিরোধী ছিল তাঁর আজন্ম সাধনায় তিনি সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করেছেন সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তায় সমুজ্জ্বল মানুষের সার্বিক জীবনকে। এবং তাঁর কবি-প্রত্যয়ের কেন্দ্রীয় মানব-সত্তাকে চিত্রিত করতে গিয়ে অনিবার্যভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, মানুষের সমাজ-সভ্যতা,
-
আমরা যে-বিষয় নিয়ে আজ আলোচনা করছি, সে-বিষয়ে আলোচনার অসুবিধের দিকটা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই কেউ কেউ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমরা অধিকাংশই রবীন্দ্রনাথের মূল ছবি দেখার সুযোগ পাই নি; রিপ্রিন্ট দেখেছি এবং তার পরিমাণও খুব বেশি নয়। রবীন্দ্রনাথ কত ছবি এঁকেছেন, এ নিয়েও একেক জন একেক রকম কথা বলেছেন। আমার মনে পড়ে, পৃথ্বীশ নিয়োগী প্রথম হিসেব দিয়েছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের ছবির সংখ্যা দুহাজারের কিছু বেশি। আজকের আলোচনায় বুলবন ওসমান উল্লেখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের ছবি হবে তিন হাজারের মতো। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, সাড়ে তিন হাজার। মনজুরুল ইসলামের বক্তব্যের ভিত্তি হচ্ছে শিবনারায়ণ রায়ের প্রবন্ধ। শিবনারায়ণ রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ ছিলেন, তিনি জানতেন, তাই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের ছবির
-
ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কৃতির মূল্যায়ন খুব একটা কম হয় নি। পশ্চিমবঙ্গে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার, সুনীল সেনগুপ্ত; বাংলাদেশে মুহম্মদ আবদুল হাই, কাজী দীন মুহম্মদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্; বিদেশে, রাশিয়ায় এ. এম. বিকোভা রবীন্দ্রনাথের ভাষাসংক্রান্ত রচনাবলির অনুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে কবির ভাষাতাত্ত্বিক প্রজ্ঞার গভীরতায় বিমুগ্ধ হয়েছেন। এদেশে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের উদ্গাতা মুহম্মদ আবদুল হাই বলেছেন:
... বিস্ময়ের বিষয় এই যে যাঁকে আমরা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং বাংলাভাষার অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ কবি বলে জানি; সেই কবি রবীন্দ্রনাথই বাংলাভাষার বর্ণনাভিত্তিক আলোচনার জনক এবং পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন (হাই ১৩৬৮: ৬৯)।
ভাষাতাত্ত্বিকেরা রবীন্দ্রনাথের দুটো ভাষাসংক্রান্ত গ্রন্থ ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ ও ‘বাংলা ভাষা পরিচয়’ বিশ্লেষণ করে তাতে বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব,
-
বিবিক্ত, বিষণ্ন ও ভয়াবহভাবে নির্জন এই কালে লোকসাহিত্যের চর্চা, পঠন-পাঠন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের চেতনার শরীরে স্নিগ্ধ মধুর প্রলেপের মতো। লোকসাহিত্যের সরল সহজ অনাড়ম্বর পৃথিবী একমাত্র ঠাঁই যেখানে মুখ লুকোবার মতো জায়গা আছে, অন্তত পিতৃমাতৃহীন এ-যুগে। লোকসাহিত্যের মধ্যে যুক্তিশাস্ত্রের নিয়মকানুন মানবার তেমন আয়োজন নেই অথচ শুধু তারই ভিতরে পর্যাপ্ত হৃদয় একেবারে ছড়িয়ে আছে, আর সেখানেই আমরা পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সংলাপে স্নিগ্ধ হতে পারি। একালের ধূসর সৃষ্টিহীন মুহূর্তে লোকসাহিত্য দেশের বিপুল জনসাধারণের সঙ্গে একাত্ম হতে শেখায়, আমাদের একাকিত্ববোধ, স্বল্পকালের জন্য হলেও, মুখর জনকণ্ঠের মধ্যে হারিয়ে যায়, ব্যক্তির আলাদা নির্জন অস্তিত্ব জন-অস্তিত্বের স্বাদ পায়, তদুপরি দেশ-কাল-পাত্রের দিগ্বলয় বিশ্ববলয়ের মধ্যে স্থিতি পায়, আমাদের বিষাক্ত
-
রবীন্দ্রসাহিত্য বিরাট মহাসাগরের মতো। তার কোথায় কি আছে, কোথায় কত গভীরতা এসব নির্ণয় করা যেমন-তেমন কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের কোনো এক কবিতায় তিনি তাঁর অনবদ্য ভঙ্গিতে অজানা বন্ধুকে যা বলেছিলেন, তার মর্মার্থ অনেকটা এই : হে বন্ধু, লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমাকে চিনি কিনা? আমি গর্ব করে বলি ‘হ্যাঁ চিনি।’ কিন্তু তারা যখন জিজ্ঞাসা করে তুমি কেমন? তখন কি যে বলবো, বুঝতে পারিনে ; কেবল বলি কি জানি? তারা তখন বিদ্রূপের হাসি হেসে চলে যায়। দেখ, আমি যে তোমাকে একেবারে চিনিনে তাই বা কেমন করে বলি? কত সকাল-সন্ধ্যা-দুপুরে আভাসে-ইঙ্গিতে হৃদয়ে তোমার স্পর্শ পেয়েছি, অভিভূত হয়েছি, কিন্তু নিশ্চয় করে ত কিছুই বলতে
-
সতেরো বছর বয়সে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের “য়ূরোপ-প্রবাসীর পত্র” প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে—বলা হয় সেই থেকে তাঁর ভ্রমণ সাহিত্যের শুরু। লক্ষণীয় কোনো উপন্যাস রচনার আগেই রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এক নাতিদীর্ঘ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়—আরো দুবছর পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালে বেরোয় ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’। কিন্তু যে সরল ও প্রাঞ্জল গদ্য ঐ সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে বেরিয়েছিল, তৎকালীন প্রচলিত গদ্যের মাপে শুধু হয়, আধুনিকতার যে কোনো মাপকাঠিতেই তা উৎকর্ষের একটি অনতিক্রম্য স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ও গদ্য ভাষার যে ফর্মটি দেখা যায় তা “য়ূরোপ প্রবাসীর” গদ্যে প্রচ্ছন্ন, এবং বোধ করি তা থেকে উদ্ভূত। বস্তুত গদ্যশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে হলে
-
বৈশাখে আমি বাংলাদেশে আসি এবং বাংলা একাডেমীর একটি সভা দিয়ে আমার এখানকার কার্যক্রম শুরু হয়। আবার বাংলা একাডেমীর সভা দিয়েই দেখছি আমার এখানকার কার্যক্রম শেষ হতে চলেছে। কাল সকালে আমার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা। বাংলা একাডেমীকে, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাবার এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। আপনারা যাঁরা আজকের এই সভায় উপস্থিত আছেন—তাঁদের সবাইকেও এই সঙ্গে আমার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের সভার বিষয় বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মহাশয় এইমাত্র আপনাদের জানিয়েছেন।
এমন একটি ব্যক্তি অথবা সত্তাকে যদি কল্পনা করা যায় তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর তবে তাঁর শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষার তাঁদের প্রয়োজন যারা সম্পূর্ণ নন। জন্মসূত্রেই সম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর কোনো সত্তার শিক্ষার
-
বৈশাখ মাস এলেই অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের রুদ্র রূপ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক রুদ্র রূপের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৈশাখ আসে মানুষের জীবনের সমস্ত জীর্ণতাকে উড়িয়ে নিতে। জীর্ণতা, অসদ্ভাব, অকল্যাণ এবং যে নির্যাতন মানুষের জীবনের মধ্যে প্রত্যহ গড়ে উঠেছে, সে নির্যাতন এবং অসদ্ভাবের বিরুদ্ধেই বৈশাখ তার কল্লোলিত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। সে কারণেই তিনি বলেছেন, যে রুদ্র বৈশাখ এখন এলো তার সঙ্গে আমি যদি সামঞ্জস্য বিধান নাও করতে পারি তাহলে আমাকে পথের এক প্রান্তে রেখে দাও, দাঁড়িয়ে আমি সমস্ত পৃথিবীর মানুষের চলাচল দেখবো, সমস্ত মানুষ যে পথে অনবরত অগ্রসর হচ্ছে, দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে
-
রবীন্দ্র-সাহিত্য মূলত বিশ্বের জিনিস, সে ভাবের জিনিস, কোনো ভাষার গণ্ডি, কোনো দেশের গণ্ডি তাকে সম্পূর্ণ বেঁধে ফেলতে পারে না—তার ভাব হতে রূপে আবার রূপ হতে ভাবে অবিরাম যাওয়া আসা। এ প্রসঙ্গেগীতাঞ্জলি’র ভূমিকায় কবি ইয়েটসের উক্তি স্মরণীয় : “রবীন্দ্রনাথ ঠকুরের কবিতাবলীর গদ্যানুবাদ আমার রক্তে এমন দোলা দিয়েছে যা বহুকাল অনুভব করিনি। দিনের পর দিন এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি আমি সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি—রেঁস্তোরা, বাস ও ট্রেনের কামরায় কবিতাগুলো পড়তে পড়তে আমি অনেক সময় পড়া বন্ধ করেছি, যাতে আমার ভাবাবেগ সহযাত্রীদের চোখে না পড়ে।... সমস্ত জীবনব্যাপী যে জগতের স্বপ্ন আমি দেখেছি কবিতাগুলো আমাকে সে রাজ্যে পৌঁছে দিয়েছে। এ কাব্য মহত্তর ঐতিহ্যের সৃষ্টি;
-
নদী কিংবা প্রবহমান জলধারাকে নানারূপে ও প্রতীকে তুলে ধরার চেষ্টা বাংলাসাহিত্যে এক ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। কবিতা, গান, ছোটগল্প ও উপন্যাসে একাধিক লেখকের হাতে নদী নানা ভূমিকায় উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথসহ পরবর্তী যুগের আধুনিক কবিদের অনেকে এই বিশেষ দিকে তাঁদের মেধা ও সময় ব্যয় করেছেন। আধুনিকদের মধ্যে এ বিষয়ে কবি বিষ্ণু দে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।
নাম উল্লেখ না করে বলা যায় এদের মধ্যে কেউ চঞ্চলা জলস্রোতে গতির সৌন্দর্য বা বেগের আবেগ লক্ষ করে অভিভূত, কেউ উদাসী জলধারায় মল্লার বা টোড়ির বিষণ্ণতা অনুভব করেন। আবার কেউ নদীস্রোতের উজান-ভাটিতে জীবনের তাৎপর্যময় রূপ খুঁজে পান এবং সে ধারায় ভেসে সচ্ছল জীবনের উন্মুক্ত পত্তনে পৌঁছাতে চান। অন্য
-
এক
১৩৪৮ সালের ২২শে শ্রাবণ রাত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রজ্বলিত মরদেহের সামনে দুঃখছিন্ন আরেক বয়ঃকনিষ্ঠ কবি গভীর বেদনায় বলে উঠেছিলেন, এই একটি লোকের চলে যাওয়ায় এখন থেকে সব পাল্টে গেল। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রায়-দৈবী সেই উচ্চারণের যাথার্থ্য যত দিন গেছে তত বেশি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। মৃত্যু যখন জীবন থেকে ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেয় তখন শূন্যতা নেমে আসে হয়তো এক বা একাধিক ব্যক্তির জীবনে, হয়তো-বা একটি কি দুটি পরিবারে। সেই ফাঁকটুকু ধীরে ধীরে ভরে দেয় সময়। জীবন নিরবধি বয়ে চলে, মৃত্যু ক্রমশ দূরস্মৃতি হয়ে থেকে যায়। বকরূপী রাক্ষস যুধিষ্ঠিরের নিকট যখন সপ্ত পরমাশ্চর্যের ধাঁধা ধরেছিলেন তখন ধর্মপুত্র একটি উত্তরে বলেছিলেন, ‘এক পরমাশ্চর্য হলো এই যে,
-
মহাকালের প্রবাহে ভাসমান জীবনের ধারাবাহিক যাত্রা বহুকাল ধরে চলে আসছে। এক মুহূর্তও না থেমে এই অবিরাম চলা এরই মধ্যে জীবন কোথাও কোথাও হয়ে উঠছে মহাজীবন, রেখে যাচ্ছে স্থায়ী চিহ্ন। অস্তিত্বের প্রখর বৈশিষ্ট্যে কোনো কোনো বিরল ব্যক্তিত্ব কালের বুকে খোদিত করে যাচ্ছেন নিজ নাম, নিজের কীর্তি। প্রত্যয়-শীলিত বক্তব্যের ও কর্মের অভিজ্ঞান ঐতিহ্য-মন্দ্রিত অতীতকে বহন করে, সমকালীন যুগ চেতনা ধারণ করে বর্তমানের সীমা অতিক্রম করে ভাবীকালের জন্য রেখে যাচ্ছে পাথেয়, পথের সন্ধান দিয়ে আহ্বান করছে প্রার্থিত গন্তব্যে পৌঁছাতে।
তেমনি একজন সত্যান্বেষী জ্ঞানসাধক, ভাবসম্পদ সমৃদ্ধ আদর্শবাদী, সৃষ্টিশীল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বিশ্বের বিপুল কর্মযজ্ঞের অক্লান্ত ও শ্রমনিষ্ঠ মহান পুরুষ কবি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জন্মের আগে থেকেই
ক্যাটাগরি
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.