বাংলাদেশ : রবীন্দ্র-সাহিত্যের মূল ভূখণ্ড
রবীন্দ্র-সাহিত্য মূলত বিশ্বের জিনিস, সে ভাবের জিনিস, কোনো ভাষার গণ্ডি, কোনো দেশের গণ্ডি তাকে সম্পূর্ণ বেঁধে ফেলতে পারে না—তার ভাব হতে রূপে আবার রূপ হতে ভাবে অবিরাম যাওয়া আসা। এ প্রসঙ্গেগীতাঞ্জলি’র ভূমিকায় কবি ইয়েটসের উক্তি স্মরণীয় : “রবীন্দ্রনাথ ঠকুরের কবিতাবলীর গদ্যানুবাদ আমার রক্তে এমন দোলা দিয়েছে যা বহুকাল অনুভব করিনি। দিনের পর দিন এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি আমি সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি—রেঁস্তোরা, বাস ও ট্রেনের কামরায় কবিতাগুলো পড়তে পড়তে আমি অনেক সময় পড়া বন্ধ করেছি, যাতে আমার ভাবাবেগ সহযাত্রীদের চোখে না পড়ে।... সমস্ত জীবনব্যাপী যে জগতের স্বপ্ন আমি দেখেছি কবিতাগুলো আমাকে সে রাজ্যে পৌঁছে দিয়েছে। এ কাব্য মহত্তর ঐতিহ্যের সৃষ্টি; তথাপি আমার মনে হয়, যেন ঘাস, তৃণ আর মাটির মতোই তা দেশাতীত।” বিখ্যাত শেক্সপিয়ার-সমালোচক এস. সি. ব্রাডলেও কবিতাগুলি পড়ে ইয়েটসের মতোই সমান আনন্দে অধীর হয়ে উঠেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, মনে হচ্ছে যেন বহুকাল পরে আমরা এক মহৎ কবিকে আমাদের মধ্যে পেয়েছি। য়ুরোপের বৃহৎ পাঠক গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়ায় এর সমর্থন রয়েছে।
এতো গেলো কবিতার কথা, ছবির ক্ষেত্রেও তাই, (যদিও তাঁর ছবি নিয়ে আমাদের দেশে তেমন কোনো আলোচনাই হয় নি)। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখে সবাই বলেছেন, “আমরা এতদিন ধরে যা করবার চেষ্টা করছি তুমি যে তাই করেছো।” মস্কোতে সেখানে সবাই বললেন, “একী! এ ছবি তুমি কোথায় পেলে? এ যে সব সোভিয়েট ছবি।” তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধের মধ্যেও সুগভীর বিশ্বানুভূতি ও উপলব্ধি ধরা পড়েছে।গোরাউপন্যাসে আনন্দময়ী বলছেন, “ছোট শিশুকে কোলে নিলেই বোঝা যায় মানুষের জাত নেই—এই কথা যদি মানুষ বোঝে বা মন দিয়ে শোনে তাহলে কি জুডা সাবান (ইহুদীর চর্বি দিয়ে তৈরী সাবান) তৈরী হতে পারে?”
"শিলাইদহ, সাজাদপুর ও পতিসরকে তিনটি বিন্দু কল্পনা করিয়া একটি ত্রিভুজ অংকিত করিলে, ইহাই হইল রবীন্দ্রসাহিত্যের তিন কোণা পৃথিবী।"— প্রমথনাথ বিশী ('রবীন্দ্র সরণী')
রবীন্দ্র-সাহিত্যের এই যে সর্ব মানবিক ধারণা, এটা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ থেকেই। বাংলাদেশ থেকেই তাঁর সাহিত্যে বিশ্বমানবতার বীজ আশ্চর্য ফসলে সার্থকতা লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথছিন্নপত্রাবলীতে নিজেও ঘোষণা করেছেন, বিশ্ব জগতের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বাংলার পল্লিপ্রকৃতি ও তার অকুণ্ঠ ঔদারিকতার মধ্যেই। আর সেই যুগের বাংলা সাহিত্যের যে তিনটি শ্রেষ্ঠ ফসল—“ছিন্নপত্র”, “সোনার তরী”, “গল্পগুচ্ছ”—এদের সমস্ত আহরিত বস্তুই তো বাংলাদেশ। বদ্ধদেব বসু “ছিন্নপত্র” সম্বন্ধে বলেছেন (অবশ্য অমর কাব্য “সোনার তরী” ও “গল্পগুচ্ছ”কে মনে রেখেই): “এমন প্রাণোচ্ছল, যুগপৎ এমন ব্যক্তিগত ও সার্বিক, অমন চির নতুন ও অফুরন্তভাবে পাঠযোগ্য পত্র পর্যায় রবীন্দ্রনাথও আর দ্বিতীয়বার রচনা করে নি।”
কল্পনা, হাস্যরস মনস্বিতা, অনুচিন্তনের আবিষ্কার ও বহির্জগতের বাস্তব তথ্য; চোখ দিয়ে দেখা ও মনে ভাবা;—এই সবই আছে “ছিন্নপত্র”, আর সেই সঙ্গে আছে আর একটি ব্যাপ্ত সত্তা, যার নাম বাংলাদেশ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারি না। ঋতু, নদী ও তৃণ তরুময় বাংলার পল্লী প্রকৃতি, তার কান্তি, গন্ধ ও আর্দ্রতা নিয়ে, এই পুস্তকের অক্ষর থেকে এমনভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যে “ছিন্নপত্র” নামটি উচ্চারণ করলেই বাংলাদেশের একটি মানসমূর্তি আমরা দেখতে পাই।” (“সঙ্গ: নিঃসঙ্গতা, রবীন্দ্রনাথ” পৃ. ১৩২)।
এভাবে রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাবো, রবীন্দ্র-সাহিত্যের মূল ভূখণ্ড বা পটভূমি বাংলাদেশ। কিভাবে এই পটভূমি গড়ে উঠেছে সে ধারণাও আমরা “ছিন্নপত্র” থেকে পাই। শিলাইদহ থেকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়। এই যে ছোট নদীর ধারে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে, এবং এই অনন্তধূসর নির্জন নিঃশব্দ চরের উপর প্রতি রাত্রে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments