স্মৃতি জাগানিয়া
বলা হয় ঘ্রাণেন্দ্রিয় বাকি সব ইন্দ্রিয়ের চেয়ে আলাদা। মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ঘটানোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা নাকি এই ইন্দ্রিয়টির আছে। যে কারণে বাকিদের তুলনায় খুব সহজেই জাগিয়ে তুলতে পারে মনের কোনো এক গহীন কোনায় হারিয়ে যাওয়া বড্ড আপন আর ভীষণ দরদী স্মৃতিদের। আর তাই হয়তো একে ভালোবেসে ‘স্মৃতি জাগানিয়া’ বলাই যায়। কোনো কোনো ঘ্রাণ তো সত্যি করেই সেই কত দিন আগের পুরোনো সব হারিয়ে যাওয়া কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মনটাকে কেমন স্মৃতিকাতর করে তোলে।
ঠিক সন্ধ্যে নামার আগ-মুহূর্তে গ্রামের গোয়াল ঘরগুলোর এক কোনায় কাঁচা ঘাস বা খড়ে আগুন জ্বালিয়ে রেখে দেওয়া হয়, গরু-বাছুরদের মশা-মাছির কামড় থেকে বাঁচাতে। এই পুড়তে থাকা কাঁচা ঘাস বা খড় থেকে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ এসে নাকে আছড়ে পড়ে। এই ঘ্রাণের অর্থ বিকেলের খেলা শেষ করে হাতমুখ ধুয়ে, চিমনি মুছে, সলতে পরিষ্কার করে, হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসা। এই ঘ্রাণের অর্থ সারাদিনের বিক্ষিপ্ত ছুটোছুটি শেষে একটু থিতু হয়ে বসা। গ্রামে বাস করা মানুষদের জন্য এই ঘ্রাণ আর পাঁচটি সাধারণ ঘ্রাণের মতোই, কোনো বিশেষত্ব নেই। তবে যে মানুষটি দুই যুগের কাছাকাছি সময় ধরে প্রাণহীন কংক্রিটের অরণ্যে বাস গেড়েছে, যার নাক আর অস্তিত্ব দুই-ই যান্ত্রিক ধোঁয়ার গন্ধ বা রাস্তার পাশের ময়লার গন্ধে অসাড় হয়ে গিয়েছে এই পোড়া ঘাস আর খড়ের ঘ্রাণ তাকে জানান দেয় সে এখনও জীবনের মানে হারিয়ে ফেলেনি। জীবনটা তার কাছে নস্টালজিয়ার এক সংগ্রহশালা হয়েই ধরা দেয় যেন। হঠাৎ কোনো এক সন্ধ্যেয় গ্রামের পথে চলতে গিয়ে নাকে-লাগা কাঁচা ঘাস আর খড় পোড়া সেই অদ্ভুত ঘ্রাণটিই হয়ে ওঠে জীবনীশক্তি। কিছু কিছু অনুভূতি শব্দের জাল বুনে বোঝানো যায় না, এই অনুভূতিটি ঠিক তেমনই এক অব্যক্ত আবেগ।
স্মৃতির ঝাঁপিতে ঘ্রাণের রাজত্ব বড্ড শক্তিশালী। একটা একটা করে স্মৃতির পাথর কুড়িয়ে জুড়ে দিয়েই না প্রাসাদ একটা গড়েছে সে। প্রাসাদের প্রতিটি কুঠুরীতে খুব যত্ন করে একটা একটা স্মৃতিকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। তবে কি না তাদের জাগানোর সোনার কাঠি-রূপোর কাঠি ওই ঘ্রাণ। যখনই অজান্তে কোনো স্মৃতি জাগানিয়া ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় তখনই নিজের সাজানো কুঠুরীতে আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে চোখ মেলে সেই স্মৃতি, কখনও স্মৃতিরা দল বেঁধেই জেগে ওঠে। ঠিক তখনই ইট-পাথরের জঙ্গলে বাস করা এই মানুষটি হয়ে যায় দুই যুগ আগের ফেলে আসা তরুণী, বা তিন দশক আগের কিশোরী।
বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়ার পরপরই মন কেমন করা যে সোঁদা এক ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে নাকে যখন ধাক্কা দেয়, তখন কংক্রিটের ইমারতগুলো চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গিয়ে ভেসে ওঠে আধা-পাকা ঘরের লাগোয়া পুকুর, সামনের দিকের উঠোন আর বৃষ্টিভেজা পথ, গাছপালা। পুকুরের পানিতে টুপটাপ করে ঝরে পড়া বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলোকে মনে করেই যেন সে এক জীবন পার করার কথা ভাবে। ওই ঘ্রাণেই যে নতুন জীবন লুকোনো থাকে! আর বৃষ্টিধোয়া গাছের ঝকঝকে সবজে পাতাগুলোর কথা মনে হলেই তো একছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে সেই দুই দশক আগের জীবনে। যে জীবনে নিশ্চিন্তে বৃষ্টিঝরা দেখা যায়, প্রাণ ভরে বৃষ্টিমাখা মাটির ঘ্রাণ নেওয়া যায়। যে জীবনে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে উঠোন-বাহিরবাড়ি পার হয়ে সরু রাস্তা ধরে হেঁটে প্রতিবেশীদের উঠোনে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে খেলার সাথীদের ডেকে এনে দল বেঁধে পুকুরে স্নান করতে নামা যায়। সে জলেও যেন থাকত এক নতুন ধরনের ঘ্রাণ—নিজের মতো করে বাঁচার। ওই বয়সে সে উপলব্ধি আসার কথা নয়, তবে চল্লিশের ঘরে হাঁটতে গিয়ে তারা প্রায়ই পেছন থেকে টেনে ধরে কি না! তাই হয়তো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments