রবীন্দ্রনাথের স্বদেশচিন্তা
মহাকালের প্রবাহে ভাসমান জীবনের ধারাবাহিক যাত্রা বহুকাল ধরে চলে আসছে। এক মুহূর্তও না থেমে এই অবিরাম চলা এরই মধ্যে জীবন কোথাও কোথাও হয়ে উঠছে মহাজীবন, রেখে যাচ্ছে স্থায়ী চিহ্ন। অস্তিত্বের প্রখর বৈশিষ্ট্যে কোনো কোনো বিরল ব্যক্তিত্ব কালের বুকে খোদিত করে যাচ্ছেন নিজ নাম, নিজের কীর্তি। প্রত্যয়-শীলিত বক্তব্যের ও কর্মের অভিজ্ঞান ঐতিহ্য-মন্দ্রিত অতীতকে বহন করে, সমকালীন যুগ চেতনা ধারণ করে বর্তমানের সীমা অতিক্রম করে ভাবীকালের জন্য রেখে যাচ্ছে পাথেয়, পথের সন্ধান দিয়ে আহ্বান করছে প্রার্থিত গন্তব্যে পৌঁছাতে।
তেমনি একজন সত্যান্বেষী জ্ঞানসাধক, ভাবসম্পদ সমৃদ্ধ আদর্শবাদী, সৃষ্টিশীল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বিশ্বের বিপুল কর্মযজ্ঞের অক্লান্ত ও শ্রমনিষ্ঠ মহান পুরুষ কবি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জন্মের আগে থেকেই তাঁর স্বদেশ ক্ষুব্ধ, অগ্নিগর্ভ। বাণিজ্যে লক্ষ্মীর বাস, এবং বাণিজ্যে গিয়ে লক্ষ্মীকে না পেলেও অলক্ষ্মীকে তো পাবেন, অব্যাহত যাত্রাশেষে যেখানে গিয়ে নামবেন, সেখানে ‘সাতরাজার ধন মানিক’ পাবেনই, এই আশা তাঁর ছিল। বাস্তবে তিনি দেখলেন তাঁর প্রার্থিত ‘মানিক’ অপহৃত হয়েছে, বাণিজ্যলোভী বিদেশি শক্তি এদেশের মানুষের দুর্বলতার ও লোভের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে রাজশক্তি হয়ে উঠেছে। ফলে ব্রিটিশ অধিকৃত পরাধীন দেশের মানুষের বুকের জ্বালা সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর মনে, প্রাণে। তরুণ কবি সেই যন্ত্রণার উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন পরধনলোলুপ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ছলে বলে কৌশলে এদেশের এবং এই দুর্ভাগা দেশের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল অন্যান্য দেশের শান্তি হরণ করে চলেছে, এ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে স্বদেশের সম্পদ বৃদ্ধি করছে অনায়াস নৈপুণ্যে, কূট চাতুর্যে। মানবতা বিরোধী, স্বার্থ প্রণোদিত কাজে শক্তি ও সাহসের চাইতে কূট-বুদ্ধি বেশি কার্যকর। পরদেশী শক্তির সম্পদ সম্প্রসারণে সাহায্য করেছিল এই দেশেরই কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ, আত্মসুখ লিপ্সু সেই কতিপয়ের কাছে স্বাদেশিকতা মূল্যহীন, দেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের অচেনা। সেই সব সাধারণ, অজ্ঞাত পরিচয় অধিকাংশদের জীবনের সুখ-দুঃখ, এমন কি ঠিকানাও জানার দরকার হয় নি এই কতিপয়ের এবং ইংরেজ সরকারের ঔদাসীন্য ও অবজ্ঞা যে অতি স্বাভাবিক, তাতে সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নেই। পনেরো আনারা অনাদৃত ও উপেক্ষিত হলেও তারাই যে এই মর্ত্যলোকের শ্রী ও সৌন্দর্যের ধারক, তা সবার জানার কথা নয়। ব্রিটিশ সরকারই বা জানবে কি করে? দুঃখ এখানেই যে এদেশের সমাজের বেশির ভাগ উচ্চশ্রেণীর বিদগ্ধরাও এই উপেক্ষিত মানুষদের সম্বন্ধে অবহিত হবার প্রয়োজন অনুভব করেন নি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া। শোষণ পীড়িত স্বাধীনতা-পিপাসু মানুষের সন্ধান যদি তাঁরা জানতেন তাহলে ১৮৫৭ সালের জাতীয় বিদ্রোহ কেবলমাত্র সিপাহী বিদ্রোহ নামে আখ্যায়িত হতো না।
"মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।"
সব যুগে, সব জায়গায় ব্যতিক্রম থাকে, এবং সেই ব্যতিক্রমী সত্তার একটি স্মরণীয় নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৮৬১ সালে ৭ই মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর নামি-দামি ঠাকুর পরিবারে তাঁর জন্ম।
নানা ঘাত-প্রতিঘাত, বিবিধ বৈচিত্র্য, অফুরন্ত জিজ্ঞাসা-কণ্টকিত অথচ উত্তরবিহীন সময়ের কখনো উত্তাল ও বর্ণময় আবার কখনো নিস্তরঙ্গ ও বর্ণহীন কালের সীমানা পেরিয়ে তাঁর অন্তহীন যাত্রার শেষ হয় ১৯৪১ সালের ২২শে আগস্ট।
“যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু নিভাইছে তব আলো—” তাদের বিধাতা ঘৃণা করেছেন না ভালোবেসেছেন, এ প্রশ্নের উত্তর তিনি জীবদ্দশায় পান নি। তিনি কিন্তু ভালোবেসেছিলেন। ভালোবেসেছিলেন নিজের পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং দেশবিদেশের মহাপ্রাণ মানুষদের এবং নিজের দেশ ও দেশের মানুষকে। সেই বিশাল হৃদয়ের ভালোবাসা ব্যাপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে,—বিশ্বের নির্যাতিত, অসহায় মানুষ—জনের মধ্যে। প্রকৃত পক্ষেই তিনি বিশ্বপ্রেমিক ছিলেন।
বিশ্ব হিতৈষণার পটভূমি রচিত হয়েছিল তাঁর অন্তরের গভীরে, চিন্তায়, চৈতন্যে, মননে, অনুশীলনে ও তার বাস্তব রূপায়ণে। তাঁর বড়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments