ভূতুড়ে বাড়ি
ঘুম যখনই ভাঙুক না কেন, একটা না একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পাওয়াই যায়। এক অশরীরী দম্পতি হাত ধরাধরি করে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাচ্ছে। এখানে এটা তুলছে, ওখানে সেটা খুলছে। আবার দেখছে সব ঠিক আছে কি না।
‘দেখো দেখো! এটা এখানেই রেখে গিয়েছিলাম!’ মেয়েটা বলে।
ছেলেটা সঙ্গে জুড়ে দেয়, ‘হ্যাঁ! এই যে দেখো এখানেও!’
'ওপরতলায়', মেয়েটা বিড়বিড় করে, ‘আর বাগানেও।’
ছেলেটা ফিসফিস করে বলে, ‘আরে! চুপ চুপ!’ তারপর দুজনে একসঙ্গে বলে, ‘নইলে যে ওদের ঘুম ভেঙে যাবে!’
ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয় যে ওরা আমাদের ঘুম ভাঙায়। একদমই অমন কিছু হয় না। ‘দেখেছ, ওরা না খুঁজেই চলেছে; কেমন পর্দা টেনে দিচ্ছে!’ বইয়ের দুই-একটা পাতা পড়েই একজন হয়তো এভাবে বলবে। ‘এখন কিন্তু ওরা খুঁজে পেয়ে গেছে!’ আরেকজন হাতের পেন্সিলটা বইয়ের কোণায় ঠেকিয়ে বলে উঠবে। তার স্বর নিশ্চিত। তারপর পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে আরেকজন হয়তো উঠে দাঁড়াবে। নিজেই দেখবে হয়তো যে বাড়িটা একেবারে খালি, দরজাগুলো খোলা। শুধু কিছু বনকপোত খুব সন্তুষ্ট হয়ে বাক-বাকুম বাক-বাকুম করে ডেকে যাচ্ছে। আর খামার থেকে শস্য মাড়াইয়ের কলটা থেকে মৃদু একটা গুঞ্জন ভেসে আসছে।
‘আমি যেন কেন এখানে এসেছিলাম?’
‘কি যেন খুঁজবো বলে ভেবেছিলাম?’
আমার হাত তো দিব্যি খালি!
‘মনে হয় ওপরতলায় আছে ওটা।’
আপেলগুলো সব চিলেকোঠার ঘরে রাখা। তারপর আবার নিচের তলায় নেমে আসা। বাগানটা সেই তো চিরকালের মতো স্থির হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। শুধু বইটাই হাত থেকে পিছলে ঘাসের ওপর পড়েছে।
কিন্তু বসবার ঘরেই ওটাকে খুঁজে পেল ওরা। এমন তো নয় যে কেউ ওদের দেখে ফেলবে। জানালার শার্সিতে আপেল আর গোলাপের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কাঁচের বুকে ভেসে ওঠা পাতাগুলো সব সবুজ। ওরা যখন বসবার ঘরে যায়, আপেলের যেদিকটা হলদে হয়ে আছে, শুধু সেদিকটাই দেখা যায়। এক মুহূর্ত পরে দরজাটা খুললেই ওটার ছায়া মেঝেতে যেন ছড়িয়ে যায়,দেয়ালে ঝুলে থাকে, আবার ছাদের ঝাড়বাতি হয়ে যায়—কী? আমার হাত সেই শূন্যই। গালিচায় একটা থ্রাশ পাখির ছায়া যেন দেখা দিয়ে গেল। নির্জনতার সবচেয়ে গভীর খাদটা থেকেই বনকপোতটা তার বাক-বাকুম তুলে এনেছে বলে মনে হয়। ‘আপদহীন, আপদহীন, আপদহীন!’ বাড়িটার যেন নাড়ি আছে আর সেটার মৃদু স্পন্দনও অনুভব করা যায়। ‘গুপ্তধন পোঁতা আছে; ঘরটা…’ সে কি! ধমনি থেমে গেল যেন! ওহ! ওটাই কি পুঁতে রাখা গুপ্তধন?
এক মুহূর্ত পরেই আলো ম্লান হয়ে এলো। তাহলে কি বাইরের বাগানেই? কিন্তু গাছগুলো তো এক টুকরো সূর্যকিরণের জন্য আঁধারটাকে এতোক্ষণ ধরে ঘুরপাক খাইয়েছে! এই যে অসম্ভব সুন্দর, দুর্লভ সূর্যকিরণটাকে আমি খুঁজি সবসময়, সেটা তো জানালার কাচের ওপাশেই মরে যায়! কাচটাই তো মৃত্যু! মৃত্যু আমাদের সঙ্গেই ছিল। কয়েকশ বছর আগে মেয়েটার কাছেই আগে এসেছিল। বাড়ি ছেড়ে, সবগুলো জানালা বন্ধ করে দিয়ে, ঘরগুলো সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা বাড়ি ছেড়ে, মেয়েটাকে ছেড়ে উত্তরদিকে গিয়েছিল, তারপর পূর্বদিকে গিয়েছিল, নক্ষত্রদের দক্ষিণের আকাশে যেতে দেখেছিল। তারপর বাড়ি ফিরে দেখে সেটা দুর্দশার নিচে তলিয়ে গিয়েছে। ‘আপদহীন, আপদহীন, আপদহীন।’ বাড়ির ধমনিটা আনন্দিত হয়ে বলে উঠল৷ ‘গুপ্তধন তো এখন তোমার।’
রাস্তায় বাতাসের তীব্র গর্জন। গাছেরা এদিক-ওদিক নুইয়ে পড়ছে। বৃষ্টির মধ্যেই পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে স্নিগ্ধ, নরম চাঁদের আলোয়। আড়ষ্ট হয়ে স্থির জ্বলছে মোমবাতিটা। আর ভূতুড়ে দম্পতিটি গোটা বাড়ি চষে বেড়াচ্ছে। নিজেদের মতো করে আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে। চুপটি করে জানালা খুলছে, ফিসফিসিয়ে কথা বলছে যেন আমাদের ঘুম না ভেঙে যায়। ‘দেখো দেখো এই যে এখানটায় আমরা ঘুমোতাম।’ মেয়েটা বলে। ছেলেটা জুড়ে দেয়, ‘কতশত চুমু!’ ‘সকালে ওঠা—’,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments