রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতিচিন্তা
এক
১৩৪৮ সালের ২২শে শ্রাবণ রাত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রজ্বলিত মরদেহের সামনে দুঃখছিন্ন আরেক বয়ঃকনিষ্ঠ কবি গভীর বেদনায় বলে উঠেছিলেন, এই একটি লোকের চলে যাওয়ায় এখন থেকে সব পাল্টে গেল। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রায়-দৈবী সেই উচ্চারণের যাথার্থ্য যত দিন গেছে তত বেশি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। মৃত্যু যখন জীবন থেকে ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেয় তখন শূন্যতা নেমে আসে হয়তো এক বা একাধিক ব্যক্তির জীবনে, হয়তো-বা একটি কি দুটি পরিবারে। সেই ফাঁকটুকু ধীরে ধীরে ভরে দেয় সময়। জীবন নিরবধি বয়ে চলে, মৃত্যু ক্রমশ দূরস্মৃতি হয়ে থেকে যায়। বকরূপী রাক্ষস যুধিষ্ঠিরের নিকট যখন সপ্ত পরমাশ্চর্যের ধাঁধা ধরেছিলেন তখন ধর্মপুত্র একটি উত্তরে বলেছিলেন, ‘এক পরমাশ্চর্য হলো এই যে, আমরা প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুলিপ্ত থেকেই মৃত্যুকে ভুলে আছি।’ মধ্যযৌবনে ত্রিশ বৎসর বয়সে পদ্মার তীরে বসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক ভ্রাতুষ্পুত্রীকে চিঠিতে লিখেছিলেন: “বেদনাটুকু ক্ষণিক এবং বিস্মৃতিই চিরস্থায়ী।...এক-একটা বিচ্ছেদ এবং এক-একটা মৃত্যুর সময় মানুষ সহসা জানতে পারে এই ব্যথাটা কি ভয়ংকর সত্যি। জানতে পারে যে, মানুষ কেবল ভ্রমক্রমেই নিশ্চিন্ত থাকে, আশঙ্কা এবং শোকই জগতের ভিতরকার সত্য। কেউ থাকে না, কিছুই থাকে না, সেটা এমনি সত্য যে স্মরণও থাকে না, শোকও থাকে না—এবং সেইটে মনে করলে মানুষ আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে যে, কেবল যে থাকব না তা নয়, কারও মনেও থাকব না। একেবারে জগতের অন্তর বাহির থেকে লোপ।” তাহলে রবীন্দ্রনাথ নামে এক ব্যক্তির জীবন ছেড়ে চলে যাওয়ায় কার জীবনে কতটুকু শূন্যতা তৈরি হয় যা কখনো ভোলা যাবে না, ভরাট করা যাবে না, যার পর থেকে সবকিছুর অর্থ পাল্টে যাবে, ভিন্নতর হবে সবকিছু, বহুমাত্রিকতা পাবে? উত্তর অনুল্লেখিত, কিন্তু আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না, রিক্ত হাহাকারদীর্ণ শোকাহত নিরালম্ব যে পড়ে থাকে সে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার নয়, তার নাম বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতি।
“১৩৪৮ সালের ২২শে শ্রাবণ রাত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রজ্বলিত মরদেহের সামনে দুঃখছিন্ন আরেক বয়ঃকনিষ্ঠ কবি গভীর বেদনায় বলে উঠেছিলেন, এই একটি লোকের চলে যাওয়ায় এখন থেকে সব পাল্টে গেল।”
সংঘবদ্ধ কোনো দল নয়, গোষ্ঠী নয়, সম্মিলিত কোনো কেন্দ্রীভূত শক্তিব্যূহ বা ভাবান্দোলন নয়, শুধুমাত্র একক কোনো ব্যক্তির তিরোধানেও একটি সমগ্র জাতি যে কেন্দ্রচ্যুত হতে পারে তার নজির রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যতীত বিশ্বসংস্কৃতির ইতিহাসে আর নেই। রবীন্দ্রনাথের থাকা ও না-থাকার প্রেক্ষাপটে বিগত এক শতাব্দীর বঙ্গসংস্কৃতিকে তার সামগ্রিক বুনোটে যদি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে যেমন স্পষ্ট হয় ঐ ব্যক্তিমানুষের যাবতীয় কর্মের দীপ্তি ও মহিমা, তেমনি ধরা পড়ে একটি জাতির ইহলৌকিক মনন-জগতের বিবর্তন তথা ঋদ্ধি বা অবনতির ধারা ও রূপরেখা। সমাজাশ্রয়ী একটি মানুষ কীভাবে দেশ ও কালের ভিতর থেকে জন্মলাভ ক’রে বেড়ে উঠতে-উঠতে, ভূগোল ও সময়কে অতিক্রম করে যায়, দেশ ও কালের ধারণাকে তৎসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে পরিবর্তিত করে দেয়, নিজের পরিবর্তমানতার সঙ্গে স্ব-কাল স্বদেশ ও স্বজনকে সাঙ্গীকৃত করে নিয়ে পথ চলতে শুরু করে, সমস্ত কিছু পাল্টে দিতে থাকে, তার ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে যে-বাঙালির বোধে ও বোধিতে এবং জীবনচর্চায় তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ব্যক্তি ও শিল্পী ইতিহাস তাই বাঙালির জীবনধারার অন্তর্গত একটি ঘটনা। রবীন্দ্রনাথের হয়ে ওঠার, বিকাশের, কাহিনী সে-কারণে বর্তমান বাঙালি সংস্কৃতির পরিণতিপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতার সহিত আন্তরসূত্রে জড়িত। রবীন্দ্র-জীবনের গতিভঙ্গি ও বিকাশ এবং রবীন্দ্রপূর্ব অর্থাৎ শতবর্ষপূর্ব বঙ্গসংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা তাই অপরিহার্য।
দুই
সংস্কৃতি বিচারের কিংবা সংস্কৃতি সম্পর্কে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে সংজ্ঞাজনিত ও মূল্যায়নঘটিত কিছু জটিলতা আছে। সব দেশের ও জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ধারাবাহিকতার স্রোতে প্রবাহিত হয়। এ যেন মানুষের জৈব দেহের জন্ম, বিকাশ ও পরিণতির মতো, অথচ সর্বাংশে তাও নয়—ব্যক্তির মৃত্যুতে জৈব দেহের পরিসমাপ্তি ও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments