রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’
এক
রবীন্দ্রনাথের জীবনের লক্ষ্য ছিল—মনুষ্যত্বের সাধনা। সে সাধনা দেশকাল বা বিশেষ ধর্মমতের গণ্ডিতে ঠেকে থাকে না। সেই জীবনসাধনার কথা তাঁর নানা রচনায় বার বার প্রতিফলিত হয়েছে। ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থটির বক্তব্য আলোচনা সূত্রে ঐ প্রসঙ্গটি আমরা এখানে তুলে ধরব।
সকল মানুষের ভিতরেই এমন একটি বিশিষ্টতা আছে, যার সার অংশ দিয়ে কালে কালে দেশে দেশে তৈরি হয়ে ওঠে একটি মানবসত্তা। রবীন্দ্রনাথ বলছেন—এই সত্তাটি হচ্ছে “সর্বজনীন সর্বকালীন মানব”। আপন জীবসত্তার দিনানুদৈনিক প্রয়োজনের সীমানা পার হয়ে সেই মানবসত্তার উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ হতে হয় মানুষকে। উপলব্ধিতে একদেশদর্শিতার সংকীর্ণতা বা বিকৃতি থাকলে সাধনা অসফল থেকে যাবে। মানুষের জানা হবে না আপন আত্মা বা আত্মস্বরূপ তথা সত্যকে। সীমা অতিক্রম করবার স্বাভাবিক তাগিদ আছে বলেই মানুষ আপনাকে প্রকাশ করতে এবং অপর মানুষের অন্তরকে জানতে সদা উৎসুক। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—“যে মানুষ আপনার আত্মার মধ্যে অন্যের আত্মাকে ও অন্যের আত্মার মধ্যে আপনার আত্মাকে জানে, সেই জানে সত্যকে”। কারণ, মানুষ একা সত্য নয়, তার বাহির বা পরিবেশ অর্থাৎ বাসভূমি এই বিশ্বকে নিয়েই তার পূর্ণ সত্য।
“মানুষের ধর্ম জয়লাভ করেছে প্রথাধর্মের সঙ্গে সংগ্রামে, জয় হয়েছে পরমমানবের।”
মানুষের ভিতরে তার দ্বিতীয় সত্তা নিরন্তর বহির্বিশ্বের ডাক শুনতে পায়, সে ডাক মানবাদর্শের ডাক। সে যা হতে চায় তা-ই হবার আহ্বান। একটা নির্দেশের মতো সে-আহ্বান মানুষকে বহু-র আন্তরসত্তার সঙ্গে মিলবার জন্যে ব্যাকুল করে। এই আহ্বান বিশ্বমানবের আহ্বান, বিশ্বমানবের ধর্মে দীক্ষিত হবার আহ্বান। বাস্তবিক, পূর্ণতা পাবার অন্তরাবেগ।
মৃত্যুর অধীন মানবদেহ নশ্বর হলেও আত্মার সাধনে মনুষ্যত্বের অংশী হিসেবে মানুষের এক অংশ অমর। বিচিত্র মানুষের মিলিত সাধনায় জন্ম নেয় সেই অমর সত্তা মানবসত্য। রবীন্দ্রভাষ্যে—এই সত্যে অধিষ্ঠিত মানব মূল্যবোধেই সভ্যতা।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে মানুষের দেহযন্ত্রের কার্যধারার তুলনা টেনেছেন। আমাদের দেহের অসংখ্য জীবকোষ বিভিন্ন সময়ে জন্ম নেয় এবং মৃত্যুবরণ করে। সাত বছর পর পর নাকি মানবদেহের জীবকোষগুলির বদল হয়। অর্থাৎ দেহের মৃত্যু না হলেও নানা সময়ে দেহের অন্তর্ভুক্ত জীবকোষের মৃত্যু ঘটে থাকে। এক জীবকোষের সঙ্গে অন্য জীবকোষ দূরে দূরে স্থাপিত হয়ে স্বতন্ত্র জীবনাচারে অভ্যস্ত। অথচ সামগ্রিকভাবে দেখলে স্বতন্ত্র জীবন সত্ত্বেও জীবকোষগুলি পূর্ণ দেহের অভিপ্রায় এবং প্রয়োজনেরই অধীন। দেহের প্রয়োজনেই তাদের জীবন। ঠিক এমনিভাবেই ব্যক্তিমানুষ আপন দেহধর্ম অনুযায়ী চলেও রহস্যজনক উপায়ে সমগ্র মানবজাতির সঙ্গে ঐক্যসূত্রে গ্রথিত। এই নিগূঢ় ঐক্যতত্ত্বেই সকল মানুষের পথ মেশে এক মহামানবের পথে। ব্যক্তিমানুষ আন্তর প্রেরণার বশেই সেই মহামানবের নির্দেশ মান্য করে তাঁরই ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করে ধন্য হয়। এই ভাবনা থেকেই নিশ্চয় রবীন্দ্রমতে—ব্যক্তি-মানবের মৃত্যুতে শাশ্বত মানবসত্তার মৃত্যু ঘটে না, জীবনের ধারা অবিচ্ছেদে বহন করে চলে মহামানবের অমোঘ নির্দেশ। এই চির-জীবনেই মানুষের সার্থকতা।
জীবকোষ সমগ্র দেহের সকল সমাচার না জেনেও দেহের স্বাস্থ্যের অনুকূলে কাজ করে যায়, এমনকি দেহে শত্রুজীবাণুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আত্মোৎসর্জনও করে। দেহের কল্যাণ বিষয়ে একটা অস্পষ্ট বা রহস্যময় বোধ তার ভিতরে কাজ করতে থাকে। এই রকম অপ্রত্যক্ষ বিষয়ের বোধ এবং কল্পনাই কাজ করে ব্যক্তিমানুষেরও অন্তরে, নিজের ভিতরে সে গড়ে তোলে বিশ্বাত্মবোধ। জানতে পারে—“সে শুধু ব্যক্তিগত মানুষ নয়, সে বিশ্বগত মানুষের একাত্ম”। তখনই ব্যক্তিস্বার্থের অতিরিক্ত কোনও ভালোর বোধ, সুন্দরের বোধ, শ্রেয়ের বোধে প্রেরিত হয়। এতে মানব-আত্মা সন্তোষ বোধ করে।
মানুষের জীবসত্তা যেখানে বাঁধা, আত্মিক সত্তা তা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে মুক্তদিগন্তের অভিসারী হয়। জন্তুর মতো নিম্নমুখী হয়ে জীবন কাটাতে পারে না মানুষ, দূরের দিকে তাকে চোখ তুলে তাকাতেই হয়। তবে, সেই দূরের পথ বড়ো বন্ধুর। রবীন্দ্রনাথ বলছেন—“এই জয়যাত্রার পথে তার সহজ প্রবৃত্তি তার পক্ষ নেয় না, এই পথে তার আরাম
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments